জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ মামলায় সাময়িক বহিষ্কার করা আট শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধামরাইয়ের ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে আটক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা শাখার প্রধান ডেপুটি রেজিস্ট্রার সুদীপ্ত শাহিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন।
মামলায় অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলেন বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের (৪৯ ব্যাচ) মো. আহসান লাবিব, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের (৪৫ ব্যাচ) রাজু আহাম্মদ, ইংরেজি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের (৫০ ব্যাচ) মো. মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের (৪৪ ব্যাচ) জুবায়ের আহমেদ, ইংরেজি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের (৪৯ ব্যাচ) হামিদুল্লাহ সালমান ও একই শিক্ষাবর্ষের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মো. আতিকুজ্জামান, সিএসই বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের (৪৭ ব্যাচ) সোহাগ মিয়া এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ২০১৬-১৭ (৪৬ ব্যাচ) শিক্ষাবর্ষের মোহাম্মদ রাজন মিয়া।
তাদের মধ্যে রাজন মিয়া, রাজু আহমেদ ও হামিদুল্লাহ সালমান শাখা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদিকে আহসান লাবিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মামলায় উল্লিখিত ওই আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) মো. আবু বকর সিদ্দিক।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত বুধবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শামীম মোল্লা প্রান্তিক গেটে এলে কয়েকজন তাকে মারধর করতে থাকে। খবর জানতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যায়।
প্রক্টর অফিসের একটি কক্ষে শামীমকে রেখে টিমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও আশুলিয়া থানা পুলিশকে বিষয়টি জানায় এবং পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার জন্য দ্রুত পুলিশকে প্রক্টর অফিসে পাঠানোর অনুরোধ করে।
ওই সময়ে আরও কয়েকজন প্রক্টরিয়াল টিমকে না জানিয়ে জোর করে শামীম মোল্লাকে প্রক্টর অফিসের পাশে নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যায়। প্রক্টর জানতে পেরে নিরাপত্তা অফিসে গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন এবং নিরাপত্তা অফিসের কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ করে দেন। এর মধ্যে আবার উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন নিরাপত্তা অফিসের কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে শামীমকে মারধর করে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পুলিশের টিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। রাত ৮টার দিকে প্রক্টরিয়াল টিম ও নিরাপত্তা শাখা শামীমকে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয়। তাকে আশুলিয়া থানায় নেওয়ার পথে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম সাভারের আশুলিয়া থানাধীন কাঠগড়া এলাকার মোল্লা বাড়ির ইয়াজউদ্দিন মোল্লার ছেলে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের (৩৯ ব্যাচ) ইতিহাসের বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় ছিনতাই, অস্ত্র ও মাদক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকে আটক : শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকার ধামরাই পৌর এলাকার মোকামটোলা মহল্লা থেকে হাবিবুর রহমান হাবিব নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি ওই মহল্লার মো. লাবু খানের ছেলে এবং ধামরাই সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি আশুলিয়া থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক সব ধরনের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদ (জাকসু) চালুর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বেলা ৩টায় শহীদ মিনার থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘এক দফা এক দাবি চাই না কোনো রাজনীতি’, ‘ডান বামের রাজনীতি, চাই না তোদের উপস্থিতি’, ‘রাজনীতির অংশীদার এই মুহূর্তে ক্যাম্পাস ছাড়’ ইত্যাদি সেøাগান দিতে দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী মুসা ভূঁইয়া বলেন, ‘সারা দেশের ক্যাম্পাসে যে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি এবং শিক্ষক রাজনীতি, সেগুলোর ফল কখনই সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য মঙ্গলজনক ছিল না। বরং এসবের প্রভাব সবসময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পড়েছে।’
