সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সিদ্ধান্তেই ভারতে ইলিশ রপ্তানি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, যে পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, তা চাঁদপুর ঘাটের এক দিনের ইলিশও না। রপ্তানির বিপক্ষে যারা বলেন, তারা ইমোশনাল।
অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। ইলিশ রপ্তানিতে বাণিজ্যিক সুবিধা আছে। ফরেন কারেন্সি আসে। রপ্তানি না করলে চোরাচালান হয়। ভারতে ইলিশ রপ্তানিতে বাহবা পেয়েছি। রপ্তানিতেও গ্রেটার ইন্টারেস্ট আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পজিটিভলি দেখেন। পেঁয়াজ আসছে না? ওরা ডিউটি কমিয়ে দিয়েছে। ইমোশনাল কথা বলে লাভ নেই। সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
গত শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী মাসে (অক্টোবর) বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে তিন হাজার টন ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতের ‘বিশেষ অনুরোধে’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। গতকাল সচিবালয়ে এক সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। উপদেষ্টা বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে এটা (রপ্তানির অনুমোদন) দিয়েছে। তারা একটা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দিয়েছে। তাদের তো আমি জোর করতে পারি না। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দিয়েছে। এতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।’
দাম বাড়লে রপ্তানি নিরুৎসাহিত করবেন কি না, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘যদি দাম বাড়ে, সে বিষয়ে অবশ্যই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রপ্তানি বন্ধের দায়িত্ব তো আমার না। আমি আহ্বান জানাতে পারি, কিন্তু বন্ধ করতে পারি না।’
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিনের মাথায় গত ১১ আগস্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমা চাচ্ছি। ভারতে কোনো ইলিশ পাঠাতে পারব না। এটা দামি মাছ। আমরা দেখেছি যে আমাদের দেশের মানুষই ইলিশ খেতে পারে না। কারণ সব ভারতে পাঠানো হয়।’
ভারতে তিন হাজার টন ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্তের পরদিন গতকাল রবিবার ইলিশ রপ্তানি বন্ধে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আমদানি-রপ্তানি কার্যালয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রকের উদ্দেশে এ নোটিস পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান। নোটিস পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে রপ্তানির বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। ব্যত্যয় হলে রিট আবেদন করা হবে বলে জানান ওই আইনজীবী।
ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে আইনি নোটিসে বলা হয়েছে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিশাল ও বিস্তৃত সমুদ্রসীমা রয়েছে। ভারতের জলসীমায় ব্যাপকভাবে ইলিশ উৎপাদন হয়। এই বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে ভারতের ইলিশ মাছ আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভারত মূলত বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ইলিশ আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশে ভারতীয় এজেন্ট ও মাছ রপ্তানিকারকরা সারা বছর পদ্মা নদীর ইলিশ মজুদ করে রাখে এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে পদ্মা নদীর সব ইলিশ ভারতে রপ্তানি করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পাচার করে। বাংলাদেশের পদ্মা নদীর সব ইলিশ ভারতে রপ্তানি ও পাচার হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণ বাজারে গিয়ে পদ্মা নদীর ইলিশ পায় না। আর বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে যে সীমিত পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যায়, তা বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট নয়।
নোটিসে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি ২০২১-২৪ অনুযায়ী ইলিশ মাছ মুক্তভাবে রপ্তানি যোগ্য কোনো মাছ নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমতি দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছে।
