রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর কয়েক দিনের অজানা আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসছে পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলার পরিস্থিতি। প্রত্যাহার করা হয়েছে ১৪৪ ধারা, শান্তি-সম্প্রীতি বৈঠক হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে। পাশাপাশি জোরদার করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল। অবশ্য ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে ডাকা ৭২ ঘণ্টার সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির কারণে যানচলাচল গতকাল সোমবার পর্যন্ত পুরোপুরি সচল না হওয়ায় জনজীবনে এর কিছুটা প্রভাব দেখা গেছে, যে কর্মসূচি শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টায়।
দুপক্ষের সংঘর্ষের পর ‘বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার’ ডাকে গত শনিবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া ৭২ ঘণ্টার অবরোধে প্রথম দুদিনের তুলনায় গতকাল রাঙ্গামাটি শহরে বাড়ে যানচলাচল। রাঙ্গামাটিতে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা পরিবহন ধর্মঘট জেলা প্রশাসকের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার রাতে প্রত্যাহারের পর গতকাল সকাল থেকে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি নিয়ে সড়কে বের হন। এতে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে জেলার জনজীবন। গতকাল সকাল থেকে শহরে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়। এতে নগর জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। পাশাপাশি রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম রুটে চলে বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। তবে বন্ধ ছিল রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি-বান্দরবান রুটে যানচলাচল। অবরোধের কারণে ছেড়ে যায়নি যাত্রীবাহী কোনো লঞ্চ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে।
এদিকে অবরোধের কারণে মেঘের রাজ্য খ্যাত সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে গিয়ে তিনদিন ধরে আটকা ছিলেন প্রায় দেড় হাজার পর্যটক। অবরোধ শেষ হওয়ার পর আজ সকালে সে সব পর্যটকদের সাজেক ছাড়ার কথা রয়েছে। তবে গত চারদিন ধরে সাজেকে বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে ছিলেন পর্যটকরা। বৃহস্পতিবার রাতে দীঘিনালা-সাজেক সড়কে বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর গাছ পড়ে সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। চারদিন ধরে জ্বালানি তেল দিয়ে জেনারেটর ব্যবহার করে পর্যটকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারলেও অবরোধে জ্বালানি তেলের গাড়ি সাজেকে যেতে না পারায় তেল সংকট দেখা দেয় সাজেকে। এতে পানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে পর্যটকরা ভোগান্তিতে পড়েন।
সেলিম উদ্দিন নামে এক পর্যটক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে আসার পর বিদ্যুৎ ছিল না। জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা সার্বক্ষণিক পাচ্ছি না। এখন নাকি জ্বালানি তেলও শেষ হয়েছে তাই জেনারেটরও চালাতে পারছে না। আজ (গতকাল) রাত কীভাবে কাটাব বুঝতে পারছি না। পানিও পর্যন্ত নেই। সব মিলে দুর্বিষহ জীবন।’
সাজেকে ৩০০-এর বেশি কটেজ ও রেস্টুরেন্টের মালিক-কর্মচারী রয়েছেন। এছাড়াও প্রায় দেড় হাজার পর্যটক অবস্থান করেন সব সময়। সবমিলিয়ে সাজেকে পর্যটক এবং ব্যবসায়ী-কর্মচারী মিলিয়ে তিন হাজার মানুষ অবস্থান করেন। খাবার, জ্বালানি তেল ও জ্বালানি গ্যাস সংকটে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট সেখানে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সাজেক অবকাশ কটেজের স¡ত্বাধিকারী বিজয় ঘোষ বলেন, ‘অবরোধের কারণে আমাদের কটেজেই ৬৫ জনসহ সাজেকে প্রায় দেড় হাজার পর্যটক আটকা পড়ে আছেন শনিবার থেকে। বিদ্যুৎ নেই বৃহস্পতিবার থেকে। জেনারেটর দিয়ে পর্যটকদের সেবা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি তেলের সংকটে সে সেবাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে গরমে শিশুরা কষ্ট পাচ্ছে। অনেক অসুস্থ রোগী আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাবারেরও সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ তেমন খাবার মজুদ রাখা হয় না। খাবার নিয়ে আসতে হয় ৪০ কিলোমিটার দূরের বাঘাইহাট থেকে। কিন্তু অবরোধের কারণে তা আনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সাজেকে মনটানা রেস্টুরেন্ট গতকাল (রবিবার) থেকে বন্ধ রয়েছে। আমাদের কটেজের লোকজনের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছি। একটি রেস্টুরেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা দুপুরে শুধু ডাল-ভাত খাওয়াতে পারবে।’
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসভাপতি চাই থোয়াই চৌধুরী জয় জানান, আটকাপড়া পর্যটকদের প্রথম দিন ৫০ শতাংশ ভাড়া ছাড় এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন ৭৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। খাদ্য অপ্রতুলতার কারণে আজ (গতকাল) রাতে কটেজ মালিক সমিতি ও ট্রাভেল এজেন্সি ইলেকট্রনিক ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে পর্যটক, গাড়ির চালক, স্টাফ সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা আমাদের অতিথি, তাদের যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি।’
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিরিন আক্তার জানান, গতকাল সাজেক থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হেলিকপ্টারে ২০ জনের মতো পর্যটক ঢাকায় ফিরেছেন। সড়কে চলাচল নির্বিঘœ হওয়ার পর বাকি পর্যটকদের আজ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান জানান, অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাঘাইহাট-দীঘিনালা সড়কে একাধিক স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। এতে গাড়ি চলাচল করতে না পারায় পর্যটকদের তিন দিন সেখানে অবস্থান করতে হচ্ছে। আজ সকালে তারা সাজেক ত্যাগ করতে পারবেন।
খাদ্য সংকটের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘খাদ্যের সংকটের বিষয়ে আমরা তেমন কোনো সংবাদ পাইনি, তবে বিদ্যুতের সমস্যা আছে।’
আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক হচ্ছে খাগড়াছড়ির জনজীবন : খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। ভয় আর আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে সেখানকার জনজীবন। গতকাল খাগড়াছড়ি বাজারের সাপ্তাহিক হাটে আসেন সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি ক্রেতা-বিক্রেতারা। অনেক পাহাড়ি জুমিয়া তাদের জুমে উৎপাদিত শাক-সবজির পসরা সাজিয়ে বসেন। তাদের নির্ভয়ে পণ্য কেনাবেচা করতে দেখা গেছে।
দীঘিনালা সড়কের ৫ মাইল নামে এলাকার ভুবন ত্রিপুরা জুমের ভুট্টা নিয়ে ভোরে বাজারে আসেন। তার মুখাবয়বে ভীতির কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। ভুট্টা বিক্রি করে গ্রামে ফিরতেই ব্যস্ততা তার।
তবে গাছবান এলাকার চাইহ্রাপ্রু মারমা বলেন, ‘কিছুটা আতঙ্ক নিয়েই বাঁশ কোড়ল আর শাক নিয়ে বাজারে এসেছি। আমরা গরিব মানুষ; মারামারি চাই না।’
জেলার অন্যতম ক্রীড়া সংগঠক ধূমকেতু মারমা বললেন, ‘এত দ্বন্দ্ব-সংঘাত করে লাভ কী। যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, আসুন তা নিরসন করে এক কাতারে সমবেত হই, গুজবে কান না দিয়ে মিলেমিশে বসবাস করি।’
সুজনের জেলা সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নির্মল কান্তি দাশ বলেন, পাহাড়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। সুবিধাবাদী গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিলের জন্যই দ্বন্দ্ব-সংঘাত জিইয়ে রাখতে চায়।’
জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান জানান, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বৃহস্পতিবারের পর এ জেলার কোথাও অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। তবুও সেনাবাহিনী টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সম্প্রীতি বৈঠক করে পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস বাড়ানোর কাজ চলছে।
এদিকে ৭২ ঘণ্টার অবরোধের শেষ দিনও দূরপাল্লাসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। তবে শহর ও শহরতলিকেন্দ্রিক অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচল স্বাভাবিক ছিল। জেলার মানিকছড়ি কলেজ এলাকায় দুপুর পর্যন্ত অবরোধের সমর্থনে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা। কিছু স্থানে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। পানছড়ি সড়কেও রাস্তায় ব্যারিকেড ছিল।
অবরোধ কর্মসূচিতে সমর্থন দেওয়া পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর জেলা সংগঠক ও মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, ‘বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে। অতীতে সৃষ্ট ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত করে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সহিংসতায় জড়িতদের বিচার করতে হবে।’
অবরোধের প্রভাব নেই বান্দরবানে : সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির তেমন একটা প্রভাব পড়েনি বান্দরবানে। অবরোধের শেষ দিনে গতকাল সকাল থেকে বান্দরবান থেকে ঢাকা, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বান্দরবান থেকে ছেড়ে গেছে দূরপাল্লার সব যানবাহন। এছাড়াও জেলার ৭ উপজেলার সড়কেও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে যাত্রী না থাকায় বান্দরবান থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। জেলা শহরে অপ্রীতিকর যে কোনো ধরনের ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন ছিল।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের শালবন এলাকার বাসিন্দা মো. মামুনকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনার জেরে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সহিংসতায় ৪ জন নিহত ও বহু লোক আহত হন।
সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি।
