বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিপদ কেটে যায়নি। আমাদের এ বিষয়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, সামনে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে একটি সম্ভাবনাময় দেশ, একটি সম্ভাবনাময় জাতি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মুক্তি হলেই সব কিছু মুক্ত হয়ে যাবে না। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি পেতে হবে। জয় পেতে হলে আমাদের আন্দোলন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা রাজনৈতিক অধিকার ফিয়ে পাওয়া। সেই অধিকার যাতে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
গতকাল সোমবার কিশোরগঞ্জ জেলা পুরাতন স্টেডিয়ামে গণসমাবেশ ও আন্দোলনে শহীদ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা প্রদান অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুম-খুন, হামলায় আহত ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন গণসমাবেশে। বিকেল ৩টায় কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর ১২টার আগে থেকেই মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন দলটির নেতাকর্মীরা। কিশোরগঞ্জ সদর, অষ্টগ্রাম, ইটনা, কটিয়াদী, ভৈরব, করিমগঞ্জ, বাজিতপুর, তাড়াইল, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কুলিয়ারচর, মিঠামইন, নিকলী এলাকার নেতাকর্মীরা হাতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান প্রতিকৃতি সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে গণসমাবেশে যোগ দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচার বাংলাদেশের মানুষকে আবদ্ধ করে রেখেছিল। বাংলাদেশের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে গুলির সামনে নিজেদের বুক পেতে কীভাবে দাবি আদায় করতে হয়। এ দেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে স্বৈরাচারীর শাসন মেনে নিতে রাজি নয়। ’৭১ সালে যেমন লাখ লাখ শহীদের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তেমনি রক্ত দিয়ে ৫ আগস্ট মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য স্বৈরাচারকে বিদায় দিতে সক্ষম হয়েছি। এই আত্মত্যাগ আমাদের ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতের জন্য তাকিয়ে আছে অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারীর পতন হলেও স্বৈরাচারের দোসররা এখনো দেশে রয়ে গেছে। আমরা বারবার বলছি বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময় যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সরকারকে ব্যর্থ করতে দেওয়া যাবে না। জনগণের প্রত্যাশা রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়া। সেই অধিকার যাতে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু এটিও সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে জনগণের কাজ যাতে নষ্ট না হয়ে যায়। আবার কোনো স্বৈরাচার ষড়যন্ত্র করার সুযোগ না পায়।’
এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা তাদের ষড়যন্ত্রকে অব্যাহত রেখেছে। গণতন্ত্রের পক্ষে সব রাজনৈতিক দল প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকতে হবে। একইভাবে আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করব। আজকে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করছে, বিএনপি ইনশাআল্লাহ জনগণের সমর্থন নিয়ে আগামী সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে। মানুষের পক্ষে কাজ করবে। বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে। সব বিপদ কেটে যায়নি, আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, সামনে নিয়ে যেতে হবে।’
বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তা ‘স্বপ্ন প্রকল্প ফ্যামিল কার্ড’ প্রদান করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিবারের মা বা গৃহিণীর নামে ‘স্বপ্ন প্রকল্প ফ্যামিল কার্ড’ দেওয়া হবে। রাষ্ট্রের পক্ষে সব নাগরিক পর্যায়ক্রমে কার্ডটি পাবে। প্রাথমিকভাবে গ্রাম-জেলা পর্যায়ের সুবিধাবঞ্চিতরা এর আওতায় আসবেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ চারজন এই বিবেচনায় এটা বিতরণ করা হবে।’
সমাবেশে বিগত ১৭ বছরের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে খুন, গুম, হামলা-মামলা, নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘আজকে যে ভয়হীন পরিাবেশ, তা তৈরি করতে বিগত ১৭টি বছর এ দেশের মানুষের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই পরিবেশটির জন্য দেশের মানুষকে ত্যাগ করতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কিশোরগঞ্জ জেলাতে ১৭ জন মানুষকে হারিয়েছি, ১৬ জন শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কিশোরগঞ্জ জেলায় যেসব উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হবে, তা বর্ণনা করেন। তিনি অঙ্গীকার করে বলেন, ‘১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারী সরকারের দোসররা টাকা পাচার করে বিদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করেছে। কিন্তু বিএনপি তা করবে না। বিএনপি যেমন আছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল থাকবে। আমরা কয়েক দিন আগে বলেছি দলের পক্ষ থেকে ৩১ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছি। ৩১ দফায় পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছি যে, আমরা চাই সবাইকে নিয়ে বিশেষ করে বিগত ১৭ বছর আমাদের সঙ্গে যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছেন, সেসব নেতাদের নিয়েই জাতি-দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে।’
গণসমাবেশে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি ও ময়মনসিংহ বিভাগ সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে এবং কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্সসহ সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ারেস আলী মামুন, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি রেজাউল করিম টিপু প্রমুখ।
