মহামারী করোনার পর থেকে দেশের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি দৃশ্যমান হতে শুরু করে। তবে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে থাকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। বিদেশি মুদ্রার সংকট ও মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। তবে যে সময়ে দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থা তখনো কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ নতুন করে ধনীর তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। মোদ্দা কথা দেশের আর্থিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ধনীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি রয়েছে, এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গত মার্চের চেয়ে ২ হাজার ৮৯৪টি বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনভিত্তিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত আড়াই বছরে দেশে আর্থিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি বেড়েছে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় যে পরিমাণের আমানত রয়েছে তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি এসব ধনী মানুষের। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় এক লাখ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নতুন করে কোটিপতি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা কষ্ট পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ এখন সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে করে ব্যাংক টাকা জমানোর চেয়ে অনেকে আগের জমানো অর্থ ভেঙে খরচ করছেন। এমন পরিস্থিতিতেও একশ্রেণির মানুষের আয় বেড়েছে। এরা হচ্ছে বিত্তশালী বা বড় প্রতিষ্ঠান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫২৩। এসব হিসাবে জমা আছে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টি। এসব হিসাবে জমা আছে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৪২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কোটি টাকা এসব হিসাবধারীর।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১ কোটি টাকার বেশি আমানতের ব্যাংক হিসাব ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৯০টি। ওইসব ব্যাংক হিসাবে মোট জমা ছিল ৭ লাখ ৪০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৮৯৪টি। তার আগে গত বছরের (২০২৩ সাল) ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। আর জমা ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। আর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেশে কোটিপতি আমানতকারী হিসাব ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক হিসাবও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল পাঁচ জন, ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪, ২০০১ সালে পাঁচ হাজার ১৬২, ২০০৬ সালে আট হাজার ৮৮৭ এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩ ।
২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০। ২০২১ সালের ডিসেম্বর বেড়ে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯৭৬ টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে সেই হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টিতে।
