বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে হামলা এবং অগ্নিসংযোগে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। বাস্তব হিসেবে এই ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ কোটি টাকা বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা।
ওই আন্দোলনের সময় সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন গ্রাহকরা। ব্যাপক গ্রাহক ভোগান্তি আর অসন্তোষের মধ্যে গত ২২ জুলাই রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন নসরুল হামিদ। সেখানে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী বিদ্যুৎ অফিস, সেখানকার উপকেন্দ্র, জাপান গার্ডেন সিটি উপকেন্দ্র, কাজলা, আজিমপুর ও চর সৈয়দপুরের বিদ্যুতের উপকেন্দ্র, নরসিংদী পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১, সেখানকার বিদ্যুৎ বিতরণের আঞ্চলিক অফিস, মাদারীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি, নারায়ণগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ ও বিদ্যুতের বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৎকালীন সরকারের অবস্থান ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল। এ কারণেই ওই আন্দোলনকে অপ্রিয় করা এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই এ ধরনের অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়েছিল। একইভাবে তারা মেট্রোরেলের বিষয়েও নানা কথাবার্তা বলেছিল। কিন্তু পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাদের এসব কথার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী যেসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছিলেন, তা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান-পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) আওতাভুক্ত। বাকি তিন বিতরণ কোম্পানিতে কোনো ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেনি। এ ছাড়া যেসব স্থানে হামলা হয়েছে, সেখানে আর্থিক ক্ষতি ছাড়া কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন কথাবার্তা তো তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) সব সময় বলে এসেছে। যে প্রকল্প ২০০ কোটি টাকায় বাস্তবায়ন সম্ভব, তাতে তারা হাজার কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এটাও হয়তো নতুন কোনো প্রকল্প বানানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।
ওই আন্দোলনের সময় তুলনামূলক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ডেসকোর। তবে প্রতিষ্ঠানটির টঙ্গী কার্যালয় এবং সেখানকার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ছাড়া আর কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে ডেসকোর একজন নির্বাহী পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলায় তাদের কিছু যানবাহন ভাঙচুর, মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন আসবাবপত্র এবং মূল্যবান বৈদ্যুতিক তার ও অন্য জিনিসপত্র লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সেখানকার বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র এবং স্ক্যাডা সিস্টেম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও অন্য যেসব ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণ নিরূপণ করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। হিসাব করে দেখা গেছে, ওই ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ কোটি টাকার কিছু বেশি।
যদিও প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে করা গেলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও কম হবে।
এদিকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ডিপিডিসির অন্তত চারটি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে তখন। প্রকৃতপক্ষে এতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে চাইলে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের কয়েকটি স্থাপনা এবং যানবাহনে হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করেছেন। তাতে দেখা গেছে, প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ঢাকার বাইরে নরসিংদী, মাদারীপুর এবং নারায়ণগঞ্জে আরইবির আওতাধীন তিনটি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির স্থাপনায় এবং যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী নামানোর পর গত ২১ জুলাই সেনাসদস্যদের টহলের জন্য সমিতির একটি গাড়ি ‘রিকুইজিশনের’ নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। ওই পিকআপটি পাঠানোর সময় পথিমধ্যে কাঁচপুর ব্রিজের নিচে হামলাকারীরা এতে হামলা চালালে গ্লাস ভাঙচুর এবং বডির সামান্য কিছু ক্ষতি হয়। এতে সব মিলিয়ে আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো।
মাদারীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জোনাব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলাকারীরা বাইরে থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে তাদের রেস্ট হাউজের কিছু গ্লাস এবং ছোটখাটো কিছু ভাঙচুর করেছে। সব মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টাকা।
নরসিংদীর মাধবদীতে পল্লীবিদ্যুতের তিনটি অফিসে গত ১৮ জুলাই হামলা করে দুর্বৃত্তরা। তবে ওই হামলায় অন্যদের সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ স্থানীয় গ্রাহকরাও ছিলেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার কর্মকর্তারা। এর ফলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে চাইলে নরসিংদী পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক আবু বকর শিবলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সদর দপ্তরে গ্লাস ভাঙচুর, দুটি মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৮ লাখ টাকা।
