পাবনার বেড়া পৌর এলাকার পায়না মহল্লায় হুরাসাগর নদের পাড়ে বেঁধে রাখা রয়েছে প্রায় ৩০টি বালু উত্তোলনের ড্রেজার। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন থেকে প্রায় এক মাস ধরে সেগুলো এভাবেই আছে। অথচ সরকার পতনের আগের দিন পর্যন্ত ড্রেজারগুলো দিয়ে দিন-রাত যমুনা ও হুরাসাগর নদ থেকে বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর ছেলে আসিফ শামস রঞ্জনের নেতৃত্বে বালু তোলা হতো রাত-দিন।
স্থানীয়রা জানান, প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হয় যমুনা নদীর পেঁচাকোলা থেকে শুরু করে হুরাসাগর নদীর পাঁচ-ছয়টি পয়েন্টে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ যমুনাপাড়ের বিভিন্ন গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে ফেলে এভাবেই কোটি কোটি টাকার বালু তোলা হলেও কাগজে-কলমে ওই এলাকায় কোনো বালুমহালই নেই। বরং ভাঙনঝুঁকির কারণে বালু তোলা নিষিদ্ধ। কয়েক বছর ধরে একক নিয়ন্ত্রণে এই বালু উত্তোলনের নেতৃত্ব দিতেন আসিফ শামস রঞ্জন। ফলে সব জেনেও না দেখার ভান করত প্রশাসন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আসিফ আত্মগোপন করেন। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন।
এলাকাবাসী জানায়, টুকু পরিবার গত ১৬ বছরে অবৈধভাবে বালু তুলে শত শত কোটি টাকা আয় করেছেন। এখন ক্ষমতার পালাবদলে লোভনীয় এই বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্রিয় কয়েকটি চক্র। আপাতত বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি এই বালুর সাম্রাজ্য দখলে মরিয়া তিন গ্রুপের বিরোধে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় সেনাবাহিনীর নজরদারি রয়েছে সেখানে। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই বালু তোলা বন্ধ করা অসম্ভব। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যমুনা নদী থেকে প্রায় ২৫ বছর ধরে বালু তোলা হচ্ছে। তবে গত তিন বছরের মতো যথেচ্ছভাবে বিপুল পরিমাণ বালু কখনো তোলা হয়নি। ২০০৮ সালের পর বিভিন্ন এলাকার শামসুল হক টুকুর প্রশ্রয়ে তার অনুসারীরা বালু তুলে বিক্রি করতেন। ২০২১ সালের প্রথম দিকে আসিফ শামস বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। পরে ওই বছরেরই নভেম্বরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিতর্কিত নির্বাচনে বেড়া পৌরসভার মেয়র হয়ে বালু উত্তোলন একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এরপর স্থানীয় ছোট ড্রেজারের পাশাপাশি ভাড়া করে আনা কয়েকটি ভারী ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা বাড়িয়ে দেন কয়েক গুণ।
অভিযোগ রয়েছে, আসিফ শামস ডেপুটি স্পিকারের প্রভাব খাটানোয় প্রশাসন বালু তোলায় বাধা দেয়নি। সরকারকে রাজস্ব দিতে হতো না বলে পুরো আয়ই যেত আসিফ শামস রঞ্জনের পকেটে।
এদিকে, অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রভাবে যমুনাপাড়ের নেওলাইপাড়া, নতুন বাটিয়াখড়া, চরনাগদাহ, হাটাইল-আড়ালিয়া, চরসাঁড়াসিয়া গ্রামসহ সাতটি গ্রামে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পাউবোর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধও পড়েছে চরম ঝুঁকির মধ্যে।
পায়না মহল্লার মো. রাতুল ও কালু শেখ নামের দুজন ড্রেজার শ্রমিক জানান, পায়নাসহ কয়েকটি মহল্লার প্রায় ৭০০ মানুষ বালু তোলার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া রয়েছেন বালুবাহী ট্রাকে কাজ করা কয়েকশ শ্রমিক। বালু তোলা বন্ধ থাকায় তারা এখন বেকার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যমুনাপাড়ের পেঁচাকোলা, মোহনগঞ্জ এবং হুরাসাগরের পাড়ে থানাপাড়া (পোর্ট এলাকা বলে পরিচিত), অধীননগরসহ কয়েকটি গ্রামের পাঁচ-ছয়টি পয়েন্টে করে বিশাল বালুর স্তূপ করে রাখা আছে। এসব জায়গায় এখনো অন্তত ১০ কোটি টাকার বালু রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। বেড়া পৌরসভার পায়না মহল্লার বাসিন্দা ও সাবেক কাউন্সিলর এনামুল হক বলেন, ‘বাবার প্রভাব খাটিয়ে আসিফ শামস অবৈধ বালু তুলে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। অনেক কৃষকের ফসলি জমি থেকেও জোর করে বালু তুলে কৃষিজমি নষ্ট করেছেন। আদালতে মামলাও হয়েছে। তবু তিনি থামেননি।’
এ ব্যাপারে পাউবোর বেড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হুরাসাগর ও যমুনার নিষিদ্ধ পয়েন্টে বালু উত্তোলন বিপজ্জনক। নদীভাঙনের পাশাপাশি বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘বেড়া উপজেলায় কোনো বালুমহাল নেই। হুরাসাগর ও যমুনার কিছু স্থানে সেনাবাহিনী ও বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং করছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বালু তোলার সুযোগ নেই। অবৈধভাবে কাউকে বালু তুলতে দেওয়া হবে না।’
