দাবি মানার পর কাজে পোশাক শ্রমিকরা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০৭ এএম

গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ার বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন। শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার পর গতকাল বুধবার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। তবে কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলনের মুখে বন্ধ ঘোষণা করা গাজীপুরের ১৪টি ও আগুলিয়ার ১৯টি কারখানা গতকালও বন্ধ ছিল। কিন্তু বেশিরভাগ কারখানা খুলে দেওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে শিল্পাঞ্চলে।

কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের টঙ্গী, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বাঘেরবাজার ও মৌচাক এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলেও গতকাল গাছা থানার ছয়দানা এলাকা ছাড়া আর কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভের সংবাদ পাওয়া যায়নি। সকালে শিল্পনগরীতে বৃষ্টিতে ভিজে যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। কারখানা এলাকায় নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও রয়েছে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল।

সকালে শিল্পনগরীর বিভিন্ন পোশাক কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। পোশাক কারখানায় নারী-পুরুষ শ্রমিকদের স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দেখা গেছে। বিসিকের বেশিরভাগ কারখানায় কাজের গতিশীলতা বাড়াতে শ্রমিকদের উৎসাহ দিতে বিনোদন হিসেবে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েল ফ্যাশনের মালিক রায়হান আহমেদ হৃদয় জানান, শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। আশা করছি, আর শ্রমিক আন্দোলন হবে না।

টঙ্গীর জাবের অ্যান্ড জুবায়েরের কারখানার পোশাকশ্রমিক মো. আবদুর রাজ্জাক ম-ল জানান, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কারখানায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। আমাদের কারখানায় কাজের উৎসাহ দিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিনোদনের জন্য সাউন্ড সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে।’

এদিকে গাজীপুর মহানগরের ছয়দানা হাজীপুর পুকুর এলাকায় একটি কারখানায় এক মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এ সময় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শিল্প-পুলিশ ও কারখানার শ্রমিকরা জানান, মহানগরীর ছয়দানা এলাকায় ফুল এভার বিডি লিমিটেড নামের একটি পোশাক তৈরি কারখানা রয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকরা চলতি মাসের ১০ তারিখে এক মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের বিক্ষোভের মধ্যে কারখানা কর্তৃপক্ষ বেতন পরিশোধ না করে ১২ সেপ্টেম্বর কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। গত সোমবার গাজীপুর প্রায় সব কারখানার সমস্যা সমাধান হলেও ওই কারখানার শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত বেতন-ভাতা পাননি।

কারখানা বন্ধের নোটিসে ফুল এভার বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উল্লেখ করেন, কিছুদিন ধরে শ্রমিকরা বাংলাদেশ শ্রম আইনবহির্ভূত কিছু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৩ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বেআইনিভাবে কাজ থেকে বিরত থাকেন। পরে মালিক, শ্রমিক, বিভিন্ন ফেডারেশন এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মীদের সব যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিলে ওইদিন শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কাজ বন্ধ করে কর্মবিরতি চালান। পরে শিল্প-পুলিশের সহযোগিতায় কোম্পানির চেয়ারম্যান রবার্ট হেইন শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করলে তারা কাজে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গীতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে গিয়ে ফেডারেশনের মাধ্যমে সমাধানের অনুরোধ করলেও তারা অস্বীকৃতি জানান। ওই পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রাখা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ধারা ১৩ উপধারা (১) অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ওই সময়ের মধ্যে বেআইনি ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকরা কোনো মজুরি পাবে না বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়।

বিক্ষোভকারী শ্রমিকরা জানান, চলতি মাসের ২৫ তারিখ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আগস্ট মাসের বেতন পাননি। আশপাশের সব কারখানায় বেতন দেওয়া হলেও তাদের কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না। তাই খুব মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে শ্রমিকদের। দোকানে বাকি, ঘরভাড়াও দিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে বেতনের দাবিতে সড়কে নেমেছেন তারা।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গাজীপুরে গতকাল ১৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ছয়দানা এলাকায় ফুল এভার বিডি লিমিটেডও একটি। তাদের শ্রমিকরা এক মাসের বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, সকাল থেকে গাজীপুরের সব কটি কারখানা খোলা রয়েছে। এখনো কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। কারখানা নিরাপত্তায় শিল্প-পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ কাজ করছে। বিজিবি ও সেনাবাহিনী টহল জোরদার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বন্ধ ঘোষণা করা ১৩টি কারখানার কোনোটিই কার্যক্রমে ফেরেনি। তবে সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল।

আশুলিয়ার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে : তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মাসিক হাজিরা বোনাস, টিফিন ও রাত্রিকালীন ভাতা বৃদ্ধি, নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়নসহ ১৮টি দফা বাস্তবায়নের মালিকপক্ষের সম্মতির পর গতকাল বন্ধ থাকা কারখানা খুলে দেওয়ায় হয়েছে। কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন।

সকালে শিল্পাঞ্চলের বাইপাইল, জামগড়া, নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বন্ধ থাকা অধিকাংশ কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টি উপেক্ষা করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে।

শিল্প-পুলিশ জানায়, আশুলিয়ায় কয়েকটি কারখানায় আর্থিক সংকটের কারণে বেতন-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা সমস্যা থাকায় ১৯টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কারখানাগুলোর বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা। তবে কিছু খাদ্য প্রস্তুত, চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতসহ অন্যান্য পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন কারখানার সামনে যৌথবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, দাবিগুলো মানা বা বাস্তবায়নের বিষয়টি শ্রমিকরা মালিকপক্ষের কাছ থেকে শুনতে চাইছেন। এখনো যেসব কারখানা বন্ধ রয়েছে, সেসব কারখানার মালিকপক্ষ, সরকারের প্রতিনিধি ও শ্রমিকপক্ষ মিলে আলোচনা করলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বন্ধ থাকা অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ায় শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছে। এরপরও শ্রম আইন-২০০৬-এর ১৩(১) ধারায় বন্ধ রয়েছে ১৪টি কারখানা। এ ছাড়া পাঁচটি কারখানায় সাধারণ ছুটি রয়েছে। এর মধ্যে চারটি নন-আরএমজি কারখানাও রয়েছে। জেনারেশন নেক্সটসহ কয়েকটি কারখানায় বকেয়া বেতন-সংক্রান্ত জটিলতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ রেখেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা জোরদারে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনসহ যৌথবাহিনীর টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে আশুলিয়ার অনন্ত গ্রুপের ১৩৯ জন শ্রমিককে বরখাস্ত করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত