মাত্র কয়েক ঘণ্টার ফারাক। এ সময় নির্বাচনী দুই ঘোষণায় ভোটপ্রিয় বাংলাদেশিদের মন ভিজেছে। আশ্বিনের আকাশে সাদা মেঘের উঁকি দেওয়ার মতো নির্বাচনের খবরেও মানুষের মন দোলায়িত হচ্ছে। যদিও ঘোষণা দুটো স্পষ্ট কিছু না। দিন-তারিখ কিছুই নেই। কিন্তু তাতে কি। সব অনিশ্চয়তা দূরে ঠেলে নির্বাচনের পথে হাঁটছেন তো, সেটাই-বা কম কীসে?
এ দেশ থেকে নির্বাচন বিসর্জনে গিয়েছিল। প্রায় তিন কোটি নতুন ভোটার নির্বাচনের স্বাদ পাননি কখনোই। ভোটের উত্তেজনা ভুলতে বসেছেন আট কোটি পুরনো ভোটারও। সব মিলিয়ে সর্বত্র নির্বাচনের জন্য হাহাকার রব।
ভোট নেই, ভোট কবে সংশয়মিশ্রিত এই প্রশ্নবাণে এখনো জর্জরিত হননি সরকারের উপদেষ্টারা। ভোট নিয়ে আহাজারির শুরুতেই উপশম নিয়ে হাজির হয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। অন্তর্বর্তী সরকারের জামানায় তিনিই প্রথম নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট কথা বলেছেন। ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনে সরকারকে সহায়তার অঙ্গীকার করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স গত সোমবার দুপুরে তার এ-সংক্রান্ত সাক্ষাৎকার প্রচারের পরপরই বিষয়টি দেশের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই নির্বাচনের আলোচনায় রসদ জোগান অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজে।
তিনি বলেছেন, সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে ভোটার তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের ফাঁকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটেছে। বর্তমান বাংলাদেশ একটি নতুন দেশ। নতুন সরকার গঠনের পর নির্বাচন, বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতিবিরোধী এবং সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশের জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এসব সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হলে এবং নতুন ভোটার তালিকা তৈরি হলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। আইএমএফের প্রধান নির্বাহী জর্জিয়েভা এই উদ্যোগে তার সমর্থনের কথা জানান।
নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধান বলার পরই তা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। ড. ইউনূস বলার পর তা আরও শক্ত ভিত পেয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ ব্যাপক আগ্রহ দেখালেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিক্রিয়ায় সতর্কতা দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতারা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তবে অন্যান্য দলের নেতারা বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তারা বলেছেন, তারাও সংস্কার চান। তবে তা যেন দ্রুত হয়। সংস্কার নিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা দরকার। প্রাথমিক একটা ঐকমত্য হলে নির্বাচনে যেতে হবে। নির্বাচিত দল সরকার গঠন করলে তারা সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নেবেন।
সেনাপ্রধানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবারই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সেনাপ্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। আমাদের কথা হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন করা দরকার। নির্বাচনকেন্দ্রিক সংস্কার শেষে নির্বাচন হওয়া উচিত। যেন জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সরকার পরিচালিত হয়।’
যদিও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স নির্বাচন নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করলে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলেন দেশ রূপান্তরকে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন। এটা সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই আমরা দেখছি। প্রধান উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন, নির্বাচন বিষয়ে সেটাই অফিশিয়াল বক্তব্য। সংস্কারে ঐকমত্য এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত হলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। অন্যদিকে সংস্কারের বিষয়গুলোও অপরিহার্য। তবে দেশের মানুষ নির্বাচন আয়োজনের সময় বা রোডম্যাপের বিষয়টি জানতে চায়। এ নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা হয়নি। সময় জানালে মানুষ আরও আশাবাদী হবে।’
সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নিয়ে আমরা ভীষণ আশাবাদী। রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে পারে না। সেই বিবেচনায় এ সরকারকেই সংস্কার করতে হবে। তাতে আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনা সরকার। এর তিন দিন পর যাত্রা শুরু হয় নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের। গত ২৮ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ‘একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদের বিদায় দেবেন। কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকেই ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন।’
নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধানের মন্তব্যের বিষয়ে ওইদিনই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সেনাপ্রধানের মন্তব্যের বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি তার পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। আমাদের দলের প্রধানও বলেছেন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করে নির্বাচন দেওয়ার জন্য।’
এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেড় মাসের একটি শিশু। সে কখন হাঁটতে পারবে সেটা সময়ই বলে দেবে। তা ছাড়া এই সরকারকে কতটা যৌক্তিক সময় দেওয়া যায়, তা নিয়ে আমাদের দলের ভেতরেও আলোচনা হচ্ছে। কিছুদিন পর আমরাও আমাদের দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের একটা সময়সীমার কথা বলব।’
বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, সংস্কার এবং নির্বাচনী উদ্যোগ নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সংস্কারের রূপরেখাসহ রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিও জানান তারা।
এ বিষয়ে বামজোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘সম্প্রতি একটা নির্বাচন হয়ে গেছে। হালনাগাদ একটা ভোটার তালিকা আছে। সেটা প্রয়োজনে আবারও হালনাগাদ হতে পারে। এটা নিয়ে খুব একটা সময় লাগার কথা না। এটা শেষ করতে আন্তরিকতাই যথেষ্ট। কিন্তু তার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এগুলো কবে হবে কোনো রূপরেখা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আছে। কিন্তু তারা অনেকগুলো বিষয় স্পষ্ট করছে না। অস্পষ্ট বিষয়গুলো মানুষকে অন্ধকারে রাখে। তখন মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে।’
নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘তিনি বেশ কয়েকটি বিষয়ে কথা বলেছেন। সেসব বিষয়ে সংস্কার, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত না করাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ঠিক কবে নির্বাচন হবে, এ বিষয়ে তিনি এভাবে বলতে পারেন না। অন্তর্বর্তী সরকারেরও অনেকে আগ বাড়িয়ে অনেক কথা বলেন। এসব কথা মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে।’
সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা জরুরি বলে মনে করছেন গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এই মুহূর্তে কোনো নির্বাচন কমিশন নেই। নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে বা সংস্কার কীভাবে হবে, সেটা এখন পর্যন্ত আলোচনায় নেই।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘দেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, গণতান্ত্রিক সংবিধান ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রোডম্যাপ এগুলো নির্ধারণ করা দরকার। শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অংশীজনের সঙ্গে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা জরুরি। আমরা আশা করছি, এ সরকার দ্রুতই আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কাজগুলো সুনির্দিষ্ট হলেই কী পরিমাণ সময় লাগবে, সেটাও নির্দিষ্ট হয়ে যাবে।’
নির্বাচণের ঘোষণা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও তা আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
