ন্যায়পরায়ণতা খোদাপ্রদত্ত একটি মহৎ গুণ। এটি খোদাভীরুতা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততাসহ শত গুণের সমষ্টিগত রূপ। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ন্যায়ের আদেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো। তা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮) রাসুল (সা.) ছিলেন ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি হলেন অনন্য, অদ্বিতীয়। যেন ন্যায়পরায়ণতাই তার অন্যতম সৌন্দর্য।
রাসুল (সা.) ছিলেন ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আপসহীন। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার জন্য তার বিচার ছিল সমান। তিনি ছিলেন ঐশীবাণীর বাস্তব প্রতিফলিত রূপ। বিচারের ক্ষেত্রে তিনি কখনো মুসলিম-অমুসলিম পার্থক্য করতেন না। দেখতেন না কোনো ভেদাভেদ। সর্বদা রবের আদেশ পালনে ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী। বিচারের ক্ষেত্রে সর্বদা তিনি প্রমাণের ওপর নির্ভর করতেন। নিম্নোক্ত দুটো ঘটনায় আমরা উপরোক্ত মহৎ গুণগুলোর বাস্তবিক চিত্র দেখতে পাব।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মুসলিমের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশে মিথ্যা শপথ করে, তাহলে সে আল্লাহর সমীপে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। আশআস (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম। এটা আমার সম্পর্কেই ছিল। আমার এবং এক ইহুদির যৌথ মালিকানায় একখণ্ড জমি ছিল। সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে নবীজির কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার কোনো সাক্ষী আছে? আমি বললাম, না। তখন তিনি ইহুদিকে বললেন, তুমি কসম করো। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে তো কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে। তখন মহান আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন, ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছমূল্যে বিক্রি করে তাদের আখেরাতে কোনো প্রাপ্য অংশ নেই। আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না।’ (সুরা আলে ইমরান ৭৭, সহিহ বুখারি)
উক্ত ঘটনায় বিচারের একদিকে ছিলেন রাসুল (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি। অন্যদিকে ছিল একজন ইহুদি। রাসুল (সা.) অবশ্যই জানতেন তার প্রিয় সাহাবি কখনো মিথ্যা বলবে না। তবুও তিনি নির্ধারিত আইনের ওপর অটল ছিলেন। এর বাইরে কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি। বাহ্যিক প্রমাণাদির মাধ্যমে যেটা ন্যায় সেটারই ফয়সালা দিয়েছেন।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মাখজুমি গোত্রের একজন মহিলা চুরি করলে তার শাস্তির বিষয়ে কুরাইশরা বিভক্ত হয়ে যায়। তারা বলে, কে এ ব্যাপারে রাসুল (সা.)-এর কাছে কথা বলতে পারবে? তখন কেউ কেউ বলল, এ ব্যাপারে উসামা (রা.) ছাড়া আর কারও কথা বলার সাহস নেই। রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে তিনি এ ব্যাপারে কথা বললেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তুমি কি আল্লাহ কর্র্তৃক নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করতে চাও? অতঃপর রাসুল (সা.) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, হে লোকসকল! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যদি কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তবে তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করত, তবে নিশ্চয়ই আমি তার হাত কেটে দিতাম। (সহিহ মুসলিম)
সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বপ্রথম দাওয়াতের বিকল্প নেই। এজন্য রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে সব সময় বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিতেন। তাদের ন্যায়ের নির্দেশ দিতেন। অন্যায়ের ভয়াবহতা বর্ণনা করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, নিশ্চয় ন্যায়বিচারকারীরা কেয়ামতের দিন দয়াময় আল্লাহর ডান পাশে নুরের সুউচ্চ মিনারায় অবস্থান করবে। (সহিহ মুসলিম) অন্যত্র বিচারকদের সাবধান করে বলেন, বিচারক তিন ধরনের। এক দল জান্নাতে যাবে। আর বাকি দুই দল যাবে জাহান্নামে। যে ব্যক্তি সত্য জেনে সেই অনুযায়ী বিচার করবে সে জান্নাতি। আর যে সত্য জেনেও সেই অনুযায়ী বিচার না করে জুলুম করবে সে জাহান্নামি। অনুরূপভাবে যে সত্য না জেনে অজ্ঞাতসারে বিচার করবে সেও জাহান্নামে যাবে। (আবু দাউদ)
