ইসলামি শিল্পের বিকাশে অনুর ক্যালিগ্রাফি

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৫১ এএম

শখ করে মানুষ কত কিছুই না করে। কিন্তু শখ থেকে মাস শেষে যদি পকেট খরচের টাকা হাতে আসে তাহলে তো সেটাকে বাহবা দিতেই হয়। শখের বসে ক্যালিগ্রাফি শুরু করেছিলেন তৌহিদ ওসমান অনু। বর্তমানে নোয়াখালী সরকারি কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে ইসলামের ইতিহাস ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি করে মাসে আয় করছেন প্রায় ২০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ এক মাসে আয় করেছেন ৩৬ হাজার টাকা। এছাড়া নিজ এলাকায় ক্যালিগ্রাফির ওপর দুটি কোর্স পরিচালনা করছেন।

ছোটবেলায় গাছপালা ও পশু-পাখির ছবি আঁকতেন। করোনার সময় কলেজ বন্ধ ছিল। একদিন ফেসবুকে ‘শৈল্পিক কওমি’ নামে একটি গ্রুপের সন্ধান পান। এই গ্রুপটি ছিল ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক। সেখানে ক্যালিগ্রাফি দেখে একা একা চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজের কাজ সেভাবে হচ্ছিল না একদম। এরপর বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার উসামা হকের কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ক্যালিগ্রাফি করা তার শখ। এ ছাড়া ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরাই তার এ পেশা বেছে নেওয়ার কারণ। সাধারণত তিনি ক্যালিগ্রাফিতে কোরআনের নির্দিষ্ট কোনো আয়াত বা আয়াতের অংশ, হাদিস, উক্তি, বাক্য ইত্যাদি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে কাপল নেইম বা সিংগেল নেইম ক্যালিগ্রাফি তার বেশ জনপ্রিয়। আবার কাস্টমার যা চান সেটাও লিখে থাকেন। ক্রেতার পছন্দ তিনি সবার আগে গুরুত্ব দেন। অনলাইনে অর্ডার নেন তার পেইজ ওসমান ক্যালিগ্রাফির মাধ্যম। ডেলিভারির বেলায় কুরিয়ারকে বেছে নিতে হয় তাকে। বেশ কয়েকটি এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘অ্যানুয়াল স্টুডেন্ট আর্ট শো ২০২৩’ যেটা দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ক্যালিগ্রাফি কিনতে গিয়ে অনেকই আলু-পটলের মতো দর কষাকষি করেন। হ্যান্ডমেইড ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংগুলোকে প্রিন্ট করা ক্যালিগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করে মূল্য বলেন। যা অনুকে খুব হতাশ করে। অনুর নিজ এলাকা মাইজদীতে আর্ট মেটারিয়ালের ভালো কোনো দোকান নেই। ফলে সব কিছু ঢাকা থেকে আনাতে হয়। অনেক সময় লাগে। কাজের বেলায় এটা তার চ্যালেঞ্জ বলে জানান।

শখের কাজের প্রথম আয় সবার জন্য বেশ মনে রাখার মতো ঘটনা। ২০২৩ সালের মার্চে অনু প্রথম আয় করেন ৩ হাজার টাকা। সেটা ছিল একটা কাপল ক্যালিগ্রাফির কাজ। তখন অনু অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। আনন্দের ঘটনা জানতে চাইলে অনু বলেন, প্রত্যেকটা কাজ সফলভাবে শেষ করতে পারলে আনন্দ অনুভব করি। তবে বড় একটি কাজ ভয়ে ভয়ে করেছিলাম। শঙ্কা ছিল কাস্টমার পছন্দ করবে তো? কাজটা হাতে পেয়ে কাস্টমার এতটাই খুশি ছিলেন যে বাড়তি টাকাও দিতে চেয়েছিলেন। পরে আরও অনেক ক্যালিগ্রাফি করতে দেন ওই কাস্টমার।

ছাত্র জনতার আন্দোলনের সময় বসে থাকেননি অনু। তিনি নোয়াখালী সুপার মার্কেটের পশ্চিম পাশে মেইন রোডের পাশের দেয়ালে আরবি গ্রাফিতির আদলে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের পতাকা আঁকেন এবং দুই পতাকার মিলনস্থলে লিখেন ‘উভয় ইতিহাসই রক্ত দিয়ে লিখা’, যা বেশ আলোচিত হয়।

ছাত্ররা শখের বসে ক্যালিগ্রাফি করতে পারে। ক্যালিগ্রাফির চাহিদা বাড়ছে। মানুষ ক্যালিগ্রাফির বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। তবে সেক্ষেত্রে দুটো পরামর্শ আছে অনুর। প্রথমত ক্যালিগ্রাফি শেখার সময় নিয়মিত প্র্যাকটিস করা এবং কাজ নিয়ে নতুন নতুন চিন্তা করা, কীভাবে কাজ আরও সুন্দর করা যায়, কাজে ভিন্নতা এবং নতুনত্ব আনা যায়। আর দ্বিতীয়ত ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা।

শুধু ক্যালিগ্রাফি নয়। গ্রাফিতিও করেন অনু। এ পর্যন্ত তিনি ৮টি গ্রাফিতি করেছেন। এর মধ্যে ৪টি গ্রাফিতি করেছেন মাইজদীতে। তিনি জানান বাসার দেয়ালেও গ্রাফিতি করা যায়। সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আরবি অক্ষর দিয়েও করা যায় অনেকটা আলপনার মতো করে। এছাড়াও আয়াত, হাদিস, বাক্য এগুলো দিয়েও করা যায়। তবে এই ক্ষেত্রে আয়াত ও হাদিসের পবিত্রতা রক্ষার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়।

তিনি নোয়াখালীতে একটি উন্নতমানের ক্যালিগ্রাফি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করবেন। যার মাধ্যমে নোয়াখালী জেলায় আরবি ক্যালিগ্রাফি তথা ইসলামি সংস্কৃতি ও শিল্পের সর্বোচ্চ প্রসার হবে। এমনটাই তার আগামী দিনের ভাবনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত