গাজা যুদ্ধের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল। গত বছর অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় দেশটি। ওই সময় থেকে মাঝেমধ্যেই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে। হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যেও। এর মধ্যে গত জুলাই মাসের শেষ দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানে হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অবশ্য গেল দুই মাসে ইরানের সঙ্গে তেমন কিছু হয়নি। কিন্তু চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে নতুন মাত্রা পায় হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল সংঘাত। বিভিন্ন ডিভাইসে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে হিজবুল্লাহর ওপর নতুন ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েল। এরমধ্যে গত শুক্রবার ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন হিজবুল্লাহ প্রধান সাঈদ হাসান নাসরাল্লাহ। ওই হামলায় গোষ্ঠীটির আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অজ্ঞাত স্থানে নিরাপদ আশ্রয় নেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত শনিবার সেখান থেকেই তিনি ঘোষণা দেন, নাসরাল্লাহর মৃত্যু ‘প্রতিশোধহীন’ যাবে না। অন্য দিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নাসরাল্লাহর মৃত্যুকে ‘ঐতিহাসিক মোড় ঘুরানো ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংগঠন ওই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করে শিগগিরই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে নাসরাল্লাহসহ একাধিক নেতাকে হত্যার পরও লেবাননে লাগাতার বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। আলজাজিরা জানাচ্ছে, গত এক সপ্তাহেই লেবাননের প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়েছে পালিয়েছে। এই সময়ে হিজবুল্লাহর সদস্যসহ শত শত বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে ইসরায়েলি হামলায়।
এদিকে বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, হাসান নাসরাল্লাহর হত্যার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ ১২টি রাষ্ট্র ২১ দিনের যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে সে অনুযায়ী সামরিক অভিযান বন্ধ করার কোনো লক্ষ্য ইসরায়েলের নেই। তাদের সামরিক বাহিনী মনে করে হিজবুল্লাহ এখন ব্যাকফুটে। সুতরাং ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি না যাওয়া পর্যন্ত তারা আরও আক্রমণ চালাতে চায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী সীমান্তের কাছে তাদের পদাতিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের ফুটেজও প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য লেবাননে যাওয়া সহজ হবে কিন্তু গাজার মতো বেরিয়ে আসতে হলে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আর এই সময়ে হিজবুল্লাহর আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম। তাই ইসরায়েল নিজে থেকে এখন হামলা বন্ধ না করলে পরে তাদের হাতেও আর সুযোগ থাকবে না। কারণ এক বছরের মধ্যে দুটি যুদ্ধে জড়ানো ইসরায়েলের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা সুবিধার না। পরে যার প্রভাব পড়বে যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, হিজবুল্লাহর দীর্ঘকালের নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনা মূলত লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। এটা সম্ভবত ওই অঞ্চলকে আরও বিস্তৃত ও বিপজ্জনক সংঘাতের আরেক ধাপ কাছে নিয়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়কেই টেনে আনতে পারে। সেটার প্রতিফল পাওয়া গেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বক্তব্যেও। গত শনিবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যু ‘প্রতিশোধহীন’ যাবে না। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ন্যায়বিচারমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অবশ্য সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড হিজবুল্লাহর মতো ইরানের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। দেশটি ইতিমধ্যেই পাঁচ দিনের শোক ঘোষণা করেছে। এছাড়া দেশটি তাদের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকেও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গোপন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে।
তেহরানের গেস্ট হাউজে ইসমাইল হানিয়ার অপমানজনক হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ ইরান এখনো নিতে পারেনি। তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের বেশ কিছু সশস্ত্র সহযোগী গোষ্ঠী আছে। যেটি তথাকথিত প্রতিরোধের অক্ষ। হিজবুল্লাহর মতো ইয়েমেনের আছে হুথি এবং ইরাক আর সিরিয়ায় আছে কয়েকটি গোষ্ঠী। ইরান এসব গোষ্ঠীকে ইসরায়েলে এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে হামলা করতে বলতে পারে।
তবে হিজবুল্লাহর জন্য এবার ঘুরে দাঁড়ানোটা খুব সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। একের পর এক আঘাতে জর্জরিত গোষ্ঠীটি। এক ডজনেরও বেশি শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডারের হত্যাকাণ্ডে এর কমান্ড কাঠামো বিপর্যস্ত। পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনায় এর যোগাযোগ কাঠামো এবং বিমান হামলায় এর অস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মেদ আল-বাশা বলেছেন, হাসান নাসরাল্লাহকে হারানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে, গোষ্ঠীটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার শঙ্কার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে এর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে পরিবর্তন করবে। তবে ইসরায়েলবিরোধী এই সংগঠনটি হুট করে ক্ষান্ত দেবে এমন প্রত্যাশা কিংবা ইসরায়েলের চাওয়া অনুযায়ী শান্তির পথে আসবে তা সম্ভবত হবে না।
হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির এখনো হাজার হাজার যোদ্ধা আছে। এদের অনেকেরই সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে এবং তারা প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি করেছে। সংগঠনটির এখনো যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যার অনেকগুলোই দূরপাল্লার। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মতো অস্ত্র আছে, যা তেল আবিব ও অন্য শহরগুলোতে পৌঁছাতে পারে।
নিজেরা আরও ধ্বংসের লক্ষ্যে পরিণত হওয়া বা নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগে সেগুলো ব্যবহারের জন্য গোষ্ঠীটির ভেতরে চাপ বাড়ছে। কিন্তু ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে তারা সেটি যদি করে এবং তাতে বেসামরিক নাগরিক হতাহত হলে ইসরায়েলের জবাব হতে পারে আরও ভয়াবহ। তাতে লেবাননের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে এবং এমনকি সেটি বিস্তৃত হতে পারে ইরান পর্যন্ত।
