সম্প্রতি প্রবাসীদের বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হবে বিদেশগামী এবং প্রত্যাবর্তনকারী প্রত্যেক প্রবাসী শ্রমিককে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে দেশে আসা এবং যাওয়া নিশ্চিত করা। সে ব্যাপারে শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ড. ইউনূসের আহ্বানের পর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
এখন প্রবাসীরা নেমে টেলিফোনে স্বজনদের ফ্রিতে সঙ্গে কথা বলতে পারছেন। লাগেজ পেতে এক সময় চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো, গত এক মাসে এমন ভোগান্তি খুবই কম।
এর পুরস্কারও দিচ্ছেন প্রবাসীরা। ক্ষয়িষ্ণু রিজার্ভের উচ্চতা বাড়াতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স বেশি পাঠাচ্ছেন তারা। চলতি বছরের জুলাই মাসে রেমিট্যান্স আসে মাত্র ১৯২ কোটি ডলার। অথচ তার আগের মাসেই রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৩ কোটি ডলার। আন্দোলনের প্রভাবে রেমিট্যান্স কমে ৬১ কোটি ডলারেরও বেশি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা। এতে বড় প্রভাব পড়ে প্রবাসী আয়ে।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে বাড়তে থাকে রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত আগস্ট মাসে ২২২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। তার পরের মাসে অর্থাৎ সদ্যসমাপ্ত হওয়া সেপ্টেম্বর মাসে ২৪০ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮০ শতাংশেরও বেশি। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।
তথ্য বলছে, সদ্যসমাপ্ত হওয়া সেপ্টেম্বরের ৩০ দিনে ২৪০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে) যা ২৮ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। আর প্রতিদিন এসেছে ৮ কোটি ডলারের বেশি বা প্রায় ৯৬২ কোটি টাকা। যদিও আলোচিত সময়ে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি ৭ ব্যাংকের মাধ্যমে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি গত আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে ১৮ কোটি ডলার বেশি এসেছে। গত আগস্টে এসেছিল ২২২ কোটি ৪১ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। আর গত বছরের একই মাসের (সেপ্টেম্বর ২০২৩) চেয়ে ১০৭ কোটি ডলার বেশি এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসেছিল ১৩৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। আলোচিত সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৫৩ কোটি ৮২ লাখ ডলার, বিশেষায়িত একটি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১১ কোটি ডলার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৬৫ কোটি ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬২ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বিদায়ী মাস সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স আসার গতি ভালো ছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল পুরো মাসে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসবে। মাসের পুরো সময়ে ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ। এখন বৈধপথে রেমিট্যান্স আসার পেছনে ব্যাংকগুলোর সচেতনতা কাজ করছে। আবার বৈধপথে ডলারের দরবৃদ্ধিতে হু-ি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আর এতেই বাড়ছে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ।
আলোচিত সময়ে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি এমন ব্যাংকের সংখ্যা ৭টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা বিডিবিএল, বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- কমিউনিটি ব্যাংক, আইসিবি ব্যাংক, বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
এর আগে দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০ সালের জুলাই মাসে। বছরওয়ারি হিসাবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স আসে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। আর চলতি বছরের জুন মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে মোট ২৫৪ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। এটি এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সদ্যবিদায়ী আগস্ট মাসের পুরো সময়ে দেশে বৈধপথে রেমিট্যান্স এসেছে ২২২ কোটি (২.২২ বিলিয়ন) ডলার। যা তার আগের বছরের (আগস্ট-২০২৩) একই সময়ের চেয়ে ৬২ কোটি ডলার বেশি এসেছে। গত বছরের আগস্ট মাসে এসেছিল প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। এছাড়া জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৪ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। তার আগের মাস মে মাসে আসে ২২৫ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এছাড়া এপ্রিলে ২০৪ কোটি ৪২ লাখ, মার্চে ১৯৯ কোটি ৭০ লাখ, ফেব্রুয়ারিতে ২১৬ কোটি ৪৫ লাখ এবং জানুয়ারিতে ২১১ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলার পাঠান প্রবাসীরা।
