ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। ইরান অন্তত একশর মতো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। হামলার পরপর ইসরায়েল জুড়ে সাইরেন বাজতে শুরু করে এবং নাগরিকরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্যরাও জরুরি বাংকারে আশ্রয় নেন। তাবরিজ, খাসান ও তেহরানের উপকণ্ঠ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘সাইরেন শুনলে একটি সুরক্ষিত এলাকায় যেতে হবে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকতে হবে।’ এ হামলার দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা নিল।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ ইসরায়েলের বিমান হামলার নিহত হওয়ার পর ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। গতকালের হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছে ইরান। হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। পাশাপাশি এ অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদেরও সুরক্ষা দেওয়া হবে।
ইসরায়েলি বাহিনী গতকাল লেবাননে সীমিত পরিসরে স্থল অভিযান শুরু করার পর তেল আবিব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান। প্রায় এক বছর আগে ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা চালায় ইসরায়েল। তাদের নির্বিচার বোমা হামলায় গাজায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর (আইআরজিসি) বরাত দিয়ে ফারসের খবরে বলা হয়েছে, নাসরাল্লাহর পাশাপাশি, হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া ও আইআরজিসির কমান্ডার আব্বাসকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, তারা ইসরায়েল অভিমুখে ‘অসংখ্য’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইরানের রক্ষী বাহিনী হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, ইসরায়েল এ হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা আবারও হামলা চালাবে। টাইমস অব ইসরায়েল ইসরায়েলি বাহিনীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অন্তত ১৫০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিশ্চিতের পাশাপাশি, আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো’ চিহ্নিত করেছে এবং পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত : মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা।
সামাজিকমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে বাইডেন বলেন, ‘এসব হামলার বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে এবং এ অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপদ রাখতে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে, সে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’
বাইডেন জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে আজ দিনের শুরুতে এক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তেল আবিবে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৮ : ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে বন্দুকধারীর গুলিতে আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও আটজন। মঙ্গলবার এ হামলার ঘটনায় হতাহতের তথ্য দিয়েছে দেশটির মাগেন ডেভিড আদম (এমডিএ) জরুরি সেবা।
ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা দুজন হামলাকারীকে নিরস্ত্র করেছে। একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
গত এপ্রিল মাসে ইরান একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল, যা ইসরায়েলি বাহিনীর সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটের ওপর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে চালানো হয়। সেই সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করেছিল। ইরান বলেছে, হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর ইসরায়েল ‘ধ্বংস’ হবে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তারা সরাসরি সেনা পাঠিয়ে ইসরায়েলকে মোকাবিলা করবে না।
এদিকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাতের সময়ে কার্যত কোনো অস্তিত্ব নেই। অর্থনৈতিক পতন, রাজনৈতিক স্থবিরতা ও অন্যান্য সংকটের ধুঁকতে থাকা দেশটিতে নতুন করে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের মধ্যে পড়েছে। যখন দেশটি কেবল নাগরিকদের দৃঢ়তায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তখন লেবাননের সরকারের দেশটির সামর্থ্য ক্রমেই ভেঙে পড়ছে আর সরকারের ভূমিকা যেন শুধু নামমাত্র রয়ে গেছে। এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির অনেক মানুষই বিদেশে গিয়ে জীবনযাপন করার সুযোগ হারিয়েছে। ব্যাংকগুলোতে তাদের জমানো টাকা থাকলেও তা তুলতে পারছেন না অনেকেই। এ ছাড়া হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা সহকারী, পাশাপাশি তরুণ পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। শিক্ষাব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে, শিক্ষকরা মাসের পর মাস বেতন পান না আর ছাত্রছাত্রীরা বই কেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
লেবাননের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বোঝা কঠিন নয়। অনেকের মতে, এ বিপর্যয় শুরু হয় ২০১৯ সালে যখন দেশটির অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেই সময়ের গণবিক্ষোভও ব্যর্থ হয়েছে লেবাননের রাজনৈতিক শ্রেণিকে সরাতে। পরের বছর করোনা মহামারী অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তোলে।
