অনাগ্রহী গ্রাহক পলাতক ঠিকাদার ঘোর সংকটে আবাসন

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:১৫ এএম

নগর অঞ্চলের আবাসনের সিংহভাগ জোগান আসে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকায় নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন গ্রাহকরা। সরকারি আবাসন খাতও নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ক্ষমতার পালাবদলে অনেক ঠিকাদার তাদের কাজ ফেলে পালিয়েছেন। এ ছাড়া নির্মাণসমাগ্রীর দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে ফ্ল্যাটের দাম। বিক্রিও কমেছে। এতে সংকটের মুখে পড়েছে আবাসন শিল্প।

এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের মতো দেশে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘তরুণদের সম্পৃক্ত করি, উন্নত নগর গড়ি’। ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবারকে বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতি বছরই পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) আবাসন খাতের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা জটিলতায় আবাসন শিল্পে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর আবাসন সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে এ খাতের উদ্যোক্তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। এ সমস্যার সমাধান না হলে আবাসন ব্যবসা থেকে বিনিয়োগ তুলে নিতে চাইবেন অনেক উদ্যোক্তা। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৬ সালে পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১২ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ২০১৭-২২ সাল পর্যন্ত গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজারের মতো ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। এরপর রাজউক কর্তৃক ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বাস্তবায়ন এবং নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে বিক্রি কমে আসে ফ্ল্যাটের। তাই ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিক্রি ১০ হাজারের নিচে নেমে আসে বিক্রি। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে যায়। তবে বিক্রি কমলেও দাম কমেনি ফ্ল্যাটের। নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্ল্যাটের মূল্যও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে আবাসনের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক আবাসনের চাহিদা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকল্পগুলো আবাসনের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে বেসরকারি খাতে অনেকাংশেই নির্ভর করছে দেশের আবাসন শিল্প। মূলত বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করাই এ শিল্পের ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান কর্মযজ্ঞ। অনেকেই আবার প্লট ক্রয় করে ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে থাকেন।

আবাসন খাতে বিনিয়োগের বড় অংশই আসে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশই বিনিয়োগ করা হয় এ খাতে। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে অনেকেই ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। অনেকেই জমানো টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে থাকেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই তাদের জমানো টাকা বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। এমন পরিস্থিতিতে অর্থ পাচারের শঙ্কা থাকে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবন নির্মাণের ভর মৌসুম চললেও আশানুরূপ ক্রেতা পাচ্ছেন না তারা। করোনা মহামারীর সময় আবাসন শিল্পে যে ধাক্কা লেগেছিল তা পুষিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। সে সময় থেকে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়তে থাকে। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পাওয়ার আগেই একটা না একটা সমস্যা এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে। তারা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে অস্থিরতা চলছে। অনেক ব্যাংক থেকে আমানতের টাকাই তোলা যাচ্ছে না। এর ওপর ঋণের কথা চিন্তা করা অবান্তর। ফ্ল্যাট ক্রেতাদের বেশিরভাগই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এরপরও তারা আশাবাদী, দেশের অর্থনীতি সচল হবে। আবাসন খাতের ঋণ সহজ করে দিলে এ সংকট অনেকটাই কাটতে পারে। জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সরকার আবাসন খাতের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

রিহ্যাবের পরিচালক এবং প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ লাবিব বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ড্যাপে ভবনের উচ্চতার বিষয়টি সংশোধন এখন সময়ের দাবি। তা না করা হলে প্রচুর সম্পদের অপচয় হবে। এজন্য ফ্ল্যাট বিক্রি এবং নির্মাণ কমে গেছে। তিনি বলেন, এ খাতে কী সমস্যা হচ্ছে, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে আবাসন শিল্পে সংকটে পড়তে পারে। আর এ শিল্প সংকটে পড়লে টাইলস, ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি সামগ্রী, এলপি গ্যাসসহ ১৩৮টি ব্যবসায়িক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের পরিবেশ ও নগরায়ণ সম্পাদক স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান বলেন, আবাস শিল্পে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। তার একটি ড্যাপের বৈষম্যমূলক নিয়ম। শহরের পরিকল্পনার জন্য ড্যাপ করা হলেও এটি নানা শ্রেণি দ্বারা প্রভাবিত করা হয়েছে, ১৫৮ বার পরিবর্তন করা হয়েছে। অনেক এলাকায় ভবনের উচ্চতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে ২০-তলা বিল্ডিংয়ের হিসাব ধরে বাজেট করা হয়েছে, সেখানে ১৫-তলার অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা ভবন নির্মাণের সাহস করছেন না। এ সংকট সমাধানে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে সরকারি পর্যায়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং হাউজ বিল্ডিং রিচার্স ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আবাসনের চাহিদা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। তবে সরকারি এসব সংস্থার উদ্যোগে নেওয়া আবাসন প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ঠিকাদারদের গাফিলতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম দুর্নীতিতে এসব প্রকল্পের সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায় না। চলমান অনেক প্রকল্পের ঠিকাদাররা (যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত) পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রড ও সিমেন্টের বিক্রিতে ধস : বেসরকারি আবাসন শিল্পে স্থবিরতার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ায় নির্মাণকাজের প্রধান দুই উপকরণ রড ও সিমেন্টের বিক্রিতে ধস নেমেছে। গত দুই মাসে কোম্পানি ভেদে রডের বিক্রি ৫০-৭০ শতাংশ এবং সিমেন্টের বিক্রি ৩৫-৪০ শতাংশ কমেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে রড ও সিমেন্ট কোম্পানিগুলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে নতুন করে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্তিমিত হয়ে পড়েছে। নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারদের অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দেওয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উন্নয়নকাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের চলমান পরিস্থিতি ও ড্যাপের কারণে আবাসন খাতে বেচাবিক্রি ও নতুন প্রকল্পও কমে গেছে। ফলে রড-সিমেন্টের বিক্রি ব্যাপকভাবে কমেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ দুই খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা একধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে ৮৬-৮৭ হাজার টাকায় প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে। গত মে-জুন মাসে যা ছিল ৯০ হাজার টাকার বেশি। অন্যদিকে মে-জুনের তুলনায় সিমেন্টের দাম প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ২০-২৫ টাকা কমেছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইস্পাত কারখানার সংখ্যা দুই শতাধিক। তার মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠান ৪০টি। প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন রড উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। যদিও দেশে বার্ষিক রডের ব্যবহার ৭৫ লাখ টন। এখন পর্যন্ত এই খাতে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। বছরে লেনদেনের পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকা।

দেশে সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪০টি (একই গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানসহ)। প্রতি বছর প্রায় চার কোটি টন সিমেন্ট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাট টন উৎপাদনের সক্ষমতা আছে এসব প্রতিষ্ঠানের।

গত বছর প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলা হয় দেশের মোট আয়তনের ১ শতাংশ (১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার) ভূমি নিয়ে ঢাকা মহানগর এলাকা গঠিত। অথচ নগর জনসংখ্যার ৩২ শতাংশই ঢাকায় বাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় সাত লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগ আশ্রয় নেয় ঢাকা শহরে। ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণের কারণে যানজট, পানিদূষণ, বায়ুদূষণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তেমনি মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি খরচ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

২০১৯ সালে প্রকাশিত অন্য এক সমীক্ষা বলছে, দেশে প্রায় ১০ লাখ পথশিশু রয়েছে। যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরে আরও বেড়েছে। ঢাকা শহরে বস্তি ছাড়াও খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে কয়েক লাখ মানুষ। তাদের আবাসনের কোনো ব্যবস্থা না করেই প্রতি বছর পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস।

বিশ্ব বসতি দিবসের কর্মসূচি : দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আজ সোমবার সকাল ৯টায় রাজউক অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ইউএন রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর ইন বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। অনুষ্ঠানে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৪-এর স্মরণিকা এবং টঘ-ঐধনরঃধঃ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের ভবন ও নির্মাণ খাতের ডিকার্বনাইজেশনের রোডম্যাপ’-এর মোড়ক উন্মোচন করবেন।

তাছাড়া দেশের সব বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। টেলিভিশন ও বেতারে বিশেষ টকশো প্রচার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত