ডুবল আরও ৪ উপজেলা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৪৬ এএম

বন্যাকবলিত শেরপুরে নদ-নদীতে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা কিছুটা কমলেও, ঢলের পানি ঢুকে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে ভাটি এলাকায়। প্লাবিত হতে শুরু করেছে নতুন নতুন এলাকা। বানের পানিতে গতকাল নতুন করে ডুবেছে জেলার দুই উপজেলার বহু জনপদ। বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এ পর্যন্ত আটজন। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন করে জেলার ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে জেলার চার উপজেলায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে বহু এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক।

শেরপুরের চারটি পাহাড়ি নদীর উজানে পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে ভাটি এলাকা শেরপুর সদর ও নকলা উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এই দুই উপজেলার শেরপুর সদরের গাজির খামার, ধলা, পাকুরিয়া, বাজিতখিলা, কামারিয়া ও বলাইরচড় ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। নকলা উপজেলা নির্বাহী অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ উপজেলার গনপদ্দী, নকলা, উরফা, গৌরদাড়, বানেশ্বর্দী, টালকী, চর-অষ্টধর, চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের ৩ হাজার ৫৩৫ পরিবারের ১৭ হাজার ৮৭০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী এবং নকলা উপজেলায় এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল জেলার ভোগাই নদীর নাকুগাঁও পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার, নালিতাবাড়ী পয়েন্টে ৪৮ সেন্টিমিটার এবং চেল্লাখালীতে ২৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য দুটি পাহাড়ি নদী মহারশি ও সোমেশ্বরীর পানি এখনো বিপদসীমার সমান রয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র, মৃগী ও দশানী নদীর পানি।

বন্যায় নাকুগাঁও স্থলবন্দর স্থবির হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে জেলার অধিকাংশ সড়ক। বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য গ্রামীণ পাকা ও কাঁচা সড়ক। পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্ন ও উঠতি আমনের ক্ষেত। বিভিন্ন স্থানে বানের পানিতে ধসে ও ভেসে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি। পানিতে ভাসছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। এসব এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও তা অপর্যাপ্ত।

ময়মনসিংহের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, হালুয়াঘাটের পানিবন্দি এলাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নারী-শিশুসহ দেড় সহস্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতদের জন্য তিন উপজেলায় ৩০ টন খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জেলা কৃষি অফিস জানায়, জেলার ধোবাউড়া উপজেলায় নিমজ্জিত ধান ১১ হাজার ৭০০ হেক্টর। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ৭ হাজার ৫০০, আংশিক নিমজ্জিত ৪ হাজার ২০০ ও সবজি ৬০ হেক্টর। হালুয়াঘাটে নিমজ্জিত ধান ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ৪ হাজার ১০০, আংশিক নিমজ্জিত ৩ হাজার ৫০০ ও সবজি ৭৫ হেক্টর। ফুলপুরে নিমজ্জিত ধান ৩ হাজার ৬৩০ হেক্টর। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ১ হাজার ৪৮০, আংশিক নিমজ্জিত ২ হাজার ১৫০ ও সবজি ৬২ হেক্টর। তারাকান্দায় জলাবদ্ধতায় ৬০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৫৬০ হেক্টর ধান ও ৪০ হেক্টর শীতকালীন আগাম সবজি।

ময়মনসিংহ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় ৭ হাজার ৮০ জন মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ৫০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর, জিগাতলা, পঞ্চনন্দপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে নেতাই নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে পুরো উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা সদর থেকে কলসিন্দুর পাকা রাস্তা, ঘোষগাঁও ধোবাউড়া পাকা রাস্তা, ঘোষগাঁও বালিগাঁও পাকা রাস্তা, মুন্সিরহাট বাজার থেকে শালকোনা পাকা রাস্তা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। তবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। এ ছাড়া পানিবন্দি অনেক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন।

হালুয়াঘাটের প্রায় সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান, সবজিক্ষেত ও ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। পানিবন্দি হয়ে আছেন হাজার হাজার মানুষ। ঘরের মধ্যে পানি ঢোকার কারণে রান্নার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। মানুষজন অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

এ ছাড়া ফুলপুর উপজেলার ছনধরা, রামভদ্রপুর, সিংহেশ^র, ফুলপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ ও অন্যান্য ইউনিয়নের আংশিক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার আমন ফসল ও সবজিক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মাছের খামার। ফুলপুরে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তারা নৌকা নিয়ে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বয়স্ক, শিশু ও নারীদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা, কাকনী, তারাকান্দা, ঢাকুয়া ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো রয়েছি। বৃষ্টি বাড়লে এখানেও পরিস্থিতি খারাপের আশঙ্কা রয়েছে।’

গতকাল সকালে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি আছে। বন্যাদুর্গত মানুষের খাদ্যসহ যে চাহিদা; সেই মোতাবেক সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ সহায়তা দিয়েছে। উপজেলাগুলোয় ৫৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করেছি। সবাই একসঙ্গে কাজ করছে। তাদের জন্য রান্না করা ও শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। সবাই মনে করছি, যদি বৃষ্টি কমে যায়; তাহলে পানি নেমে যাবে। তবে বৃষ্টি কমছে না। আবহাওয়া অফিস বলছে, আরও এক দিন বৃষ্টি থাকতে পারে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত