মনিরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিলেন পুলিশের সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তার কথায় সব চলত পুলিশ প্রশাসন। প্রায় ১৬ বছর ধরেই তিনি ঢাকায় চাকরি করেছেন। ছিলেন বড় বড় পদে। ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। সর্বশেষ ছিলেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান। গত ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটলে তিনি চলে যান আত্মগোপনে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় একাধিক হত্যা মামলা। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় ক্ষমতাধর এ পুলিশ কর্মকর্তাকে। তাকে আটক করতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি চলে যান ভারতের দিল্লিতে। দিল্লির কণট প্লেসের একটি গ্রোসারি স্টোরে গত রবিবার বিকেলে তাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সময় দেখা গেছে। মনিরুলের মতোই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দাবি করেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত মাসের মাঝামাঝিতে মনিরুল ইসলাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান ভারতে। সরকার পতনের দিন তিনি আটকা পড়েন পুলিশ সদর দপ্তরে। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দারসহ সাত-আট কর্মকর্তা। তাদের বিশেষ একটি হেলিকপ্টারে করে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকে তাদের হদিস মিলছে না। তবে এরই মধ্যে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনুপস্থিত থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের ধরতে আমরা খুঁজছি। যারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন তাদের বাসার ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব মিলছে না। বেশিরভাগ কর্মকর্তা বাসায়ও থাকছেন না। আমাদের কাছে তথ্য আছে, একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নানা উপায়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, মো. আতিকুল ইসলাম, মো. আবদুল বাতেন, কৃষ্ণপদ রায়, খন্দকার লুৎফুল কবির, মীর রেজাউল আলম, ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, মো. আসাদুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মোজাম্মেল হক, সরদার রকিবুল ইসলাম, মো. ইমাম হোসেন এবং অ্যাডিশনাল ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে। বেশিরভাগই ভারতে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মীর রেজাউল আলম অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে গেছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ভারতে চলে গেছেন। আলোচিত আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদের হদিসই মিলছে না। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন সেই তথ্যও নেই। আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তাদের ধরতে প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। সবার বিরুদ্ধেই একাধিক হত্যা মামলা আছে। তবে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তারা নিয়মিত অফিস করছেন। তাদের কোনো সমস্যা হবে না। আন্দোলনের সময় তারা ভালো স্থানে থাকলেও শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজনের হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের কর্মকা- গভীরে গিয়ে আমরা পর্যালোচনা করছি।
পুলিশ সূত্র জানায়, কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ ৭৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা এই প্রথম। এই নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে।
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি ভারতে পালিয়ে যান। এমনকি পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও চলে যান আত্মগোপনে। পুলিশ সদর দপ্তরসহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলপ্রয়োগ করেছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ওইসব কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানীতে নিহতের ঘটনায় অর্ধশত হত্যা মামলায় অন্তত দেড়শর বেশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) থেকে শুরু করে ডিএমপির কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, উপকমিশনার, সহকারী কমিশনার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আছেন। পাশাপাশি ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলদেরও আসামি করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রথম থেকেই বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন পুলিশের অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তা। আন্দোলনকারীদের হয়রানি, সমন্বয়কদের হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনসহ নির্বিচারে গুলি করে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যার নির্দেশদাতা বিতর্কিত ওইসব কর্মকর্তা লাপাত্তা। তাদের অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। খোদ পুলিশের মধ্যেই আছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন, তারা একটি বিশেষ বাহিনীর হেফাজতে আছেন। কারও দাবি, তারা প্রশাসনের সহায়তায় দেশ ছেড়েছেন। আবার গণপিটুনি খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এমন তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে।
৫ আগস্টের পর এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. মাহবুবুর রহমান, মো. আতিকুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. আবদুল বাতেন, কৃষ্ণপদ রায়, খন্দকার লুৎফুল কবির ও মীর রেজাউল আলম, ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, মো. আসাদুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মোজাম্মেল হক, সরদার রকিবুল ইসলাম ও মো. ইমাম হোসেন এবং অ্যাডিশনাল ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবিরকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসা শুরু করে। পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিএমপি কমিশনার ও র্যাব মহাপরিচালক দ্রুত সময়ে নিয়োগ দেওয়ার পর পুলিশের কাজের পরিবেশ আনার চেষ্টা চালানো হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন পুলিশের সবকটি ইউনিটির কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা কর্মস্থলে যোগ দেন। আগের অবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করছে পুলিশ। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের জোরালো অভিযান চলছে। রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছে পুলিশ। ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশের স্থাপনাগুলোও মেরামত করা হচ্ছে। লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
