২০২০ সালে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময়ে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। এরই মধ্যে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ও প্রকল্পকাজ শুরু করতে না পারায় প্রায় ৩৭ শতাংশ ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। চার বছর পর নতুন সংশোধনী আনায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটির ব্যয় ৬ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকায়। ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি চলমান এ প্রকল্পের মেয়াদও আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এতে ঋণ দেবে জাইকা। প্রকল্পটিতে অর্থায়নে আগ্রহ ছিল চীন এবং ভারতের।
প্রকল্পটির বিষয়ে একনেক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের অর্থায়নকে সরকার প্রাধান্য দেবে। কারণ কোন দেশ এটি নির্মাণ করবে, তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। সব যাচাই-বাছাই শেষে জাপানকে নিরাপদ মনে করছে বর্তমান সরকার। তাদের ঋণের শর্ত ভালো। প্রকল্পে অনিয়ম হলে তা বিচারের জন্য দেশটিতে আইনি কাঠামোও বেশ শক্ত।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে এটাই সব থেকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প হবে। এই প্রকল্পের অনেক ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যও আছে। কারা এটা করছে, সেটাও একটা বড় বিষয়। আমরা সবাই জানি, একটি গভীর সমুদ্রবন্দর আমাদের অবশ্যই লাগবে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, তখন এটা লাগবে। গভীর সমুদ্রবন্দর না হলে পরিবহন খরচ ও সময় অনেক বেশি হয়।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, ‘আমরা সাহস করে এই প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছি এ কারণেই যে, অনেক দিন ধরে চীন করবে না ভারত করবে এ নিয়ে বহু টানাপড়েন চলছিল। কোনো কিছুই হচ্ছিল না। আমরা ভাবলাম এই কারণে যে, জাপান খুব সহজ শর্তে ঋণ দেয়। জাপানি প্রকল্পগুলো ঠিক খরচ ও সময়ের মধ্যে শেষ হয়। জাপানি প্রকল্পে দেশীয় কোনো ঠিকাদার দুর্নীতি করেছে, এমন কোনো প্রমাণ আমি নিজেও কখনো শুনিনি। এ ছাড়া জাপানি কোনো ঠিকাদার যদি বিদেশে গিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কোনো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং সেটা প্রমাণিত হয়, তাহলে জাপানের আইন অনুযায়ী ওই ঠিকাদারকে দেশটি শাস্তি দিয়ে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়াও এমনটি করে থাকে।’
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। পরে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় ৩০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৮০৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা করা হয়। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজর ৩৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বাকি ১৭ হাজার ৯৬৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেবে জাইকা এবং নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৮৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা দেবে চবক।
প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত মেয়াদকাল ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় সংশোধনীতে তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যের বিষয়ে ডিপিপিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোসহ ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা মেটানো।
প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে, সওজ অংশে ২৬০ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অংশে ১ হাজার ৩১ দশমিক ৭৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ। ৭৬০ মিটার বেরিথ নির্মাণ। ৩৯৭ মিটার ব্রেকওয়াটার নির্মাণ। সড়ক প্রতিরক্ষাসহ ১৬ দশমিক ৫২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। সংযোগ সড়কসহ ব্রিজ নির্মাণ। পরামর্শক সেবা ইত্যাদি।
বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় এ ব্যয় বেড়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ৪৬১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তনের জন্য ৬৭৪ কোটি ৬৪ লাখ, হালনাগাদ রেট শিডিউলের জন্য ১ হাজার ৯১৪ কোটি ১৬ লাখ এবং অ্যাকসেসিবিলিটি উইথ হাই ডিফিকাল্টি জোনের জন্য ৯০৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাইকার অনুমোদন বা অনাপত্তি দিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় এক বছর অতিরিক্ত সময় নেওয়া হয়। বিডারদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ায় জাইকার পরামর্শে প্রাইস নেগোসিয়েশনের জন্য অতিরিক্ত সাড়ে ৪ মাস প্রয়োজন হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে ভৌত ও বাস্তব কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পের বন্দর অংশের প্যাকেজ-১-এর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে চুক্তির মেয়াদ ৪২ মাস নির্ধারিত। ফলে ৪২ মাসের কার্যাদেশ অনুযায়ী ডিসেম্বর ২০২৭ সালে কাজ সমাপ্ত হবে এবং পরবর্তী সময়ে আরও এক ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড নির্ধারিত আছে। সেই লক্ষ্যে প্যাকেজ-১-এর কার্যক্রম সমাপ্ত করতে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
