সংলাপ মানেই যেন দাবির পাহাড়

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০৫ এএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিনের মাথায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এমন একটা সময়ে এই সরকার দায়িত্ব নেয় যখন দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অর্থনীতিরও ভঙ্গুর অবস্থা। অন্যদিকে টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে নানা ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব।

সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে তৃতীয় দফায় রাজনৈতিক দলগুলো সঙ্গে বৈঠক করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তৃতীয় দফার আলোচনার প্রথম পর্বে বিএনপি-জামায়াতসহ আটটি দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। এ বৈঠকে ১৬ বছরের অসংখ্য অন্যায়, অনিয়ম ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরে নানা খাতে সংস্কারের দাবি নিয়ে সরকারের কাছে হাজির হয় রাজনৈতিক দলগুলো। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি-দাওয়ার যেন শেষ নেই এসব দলের। বৈঠকে দেড়শর বেশি দাবি জানানো হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে। এসব দাবি-দাওয়ার মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হলেও সংস্কার ও নির্বাচনের প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে দলগুলোর মধ্যে, যা চলমান সংলাপে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অচলাবস্থা কাটাতে যে সংস্কারগুলো প্রয়োজন সেগুলো অবশ্যই এ সরকার করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সব প্রত্যাশা হয়তো পূরণ করা এ সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। তারা সংস্কারের অগ্রগতির ধারা সূচনা করে দিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। চাপ নয়, সময় দিতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছে, রাজনৈতিক মতৈক্য গড়ে সংস্কারের বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করা হবে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হবে। এরপর নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

কিন্তু নির্বাচনের রূপরেখা এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের জন্য যে কমিশন গঠন করা হয়েছে, তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ফের আলোচনায় বসে তারপর নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করা হবে।

রাজনৈতিক দলের যত দাবি : অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির পূর্বঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। যার মধ্যে রয়েছে সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন; সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা; পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে না পারা; সংসদে উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন। একই সঙ্গে বিগত সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ও যারা দোসর হয়ে কাজ করেছেন তাদের এবং গুম-খুন ও গণহত্যায় সহায়তাকারীদের বিচারের দাবি রয়েছে। এর বাইরে বিগত সরকারের সময় মিথ্যা অভিযোগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা সাজানো মামলা প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা এবং প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে দুটি রোডম্যাপ চেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এর বাইরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোয় সংস্কারের একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছে দলটি। এ ছাড়া সংস্কারের ক্ষেত্রে নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবনা রয়েছে তাদের। দলটির নেতারা মনে করেন, এ কাজগুলো করার মাধ্যমে দেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আগেই ১৩ দফা দাবি জানিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে এর সঙ্গে যুক্ত আরও ৯টি সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশনগুলোর কার্যপরিধি ও রোডম্যাপ বিষয়ে স্পষ্ট করা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাসহ সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার গড়ে তোলার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে জোটভুক্ত দলগুলো।

সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দফা উপস্থাপন না করলেও বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয় ছয় দলের এই জোট থেকে। রাজনৈতিক দল ও ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক কাউন্সিল গঠন এবং সংস্কার করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার তাগিদ দিয়েছে এ জোটটি।

দাবি-দাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই গণ অধিকার পরিষদও। সংসদের মেয়াদ এক বছর কমিয়ে চার বছর নির্ধারণের পাশাপাশি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের দাবিও জানিয়েছ দলটি। তাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র সংস্কারে ১২ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আট দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে গণ অধিকার পরিষদের আরেকটি অংশ (রেজা কিবরিয়া)। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিসর বাড়িয়ে ৫০ সদস্য করা, আওয়ামী লীগের আমলে অবৈধভাবে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের পদ থেকে অব্যাহতি এবং সংস্কার কমিশনগুলোতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা।

অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে ৬ দফা পর্যবেক্ষণ ও ১১ দফা প্রস্তাবনা পেশ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ও প্রস্তাবনার বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কথা হয় শিক্ষাবিদ ও চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় এসেছে। উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করেছে এবং শুরু থেকেই বলে আসছে নির্বাচনের পরিবেশ আনতে হলে অবশ্যই কিছু রিফর্ম (সংস্কার) দরকার। আমার মনে হয় কিছু ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে ছয়টি কমিশন গঠন করা হলো, সেগুলোর কাজও কেবল শুরু হলো। প্রধান উপদেষ্টাও সংকট-সমস্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত যা বলেছেন তা বিমূর্ত কথা। তাদের খারাপ মতলব আছে এটা আমি মনে করি না। সততার সঙ্গে তারা কাজ করবেন, সময় লাগবে। সমস্যা এত জটিল যে, সব সহজে সমাধান হবে তা নয়। তবে এখনই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।’

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘যদি দেখা যায় তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) কোনো গণবিরোধী লাইন নিয়েছে তখন সমালোচনা বা বিরোধিতা করা উচিত হবে। তাদের আরও সময় দিতে হবে। সমালোচনা মানে খারাপ কিছু না। আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়, ন্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়।’

শুধু নির্বাচন নয়, তার পাশাপাশি কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধানও অন্তর্বর্তী সরকারকে করতে হবে এমন মত দিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘এ সরকার খুব তাড়াতাড়ি নির্বাচন দিয়ে চলে যাবে, এটা হয় না। আমাদের মূল সমস্যা যেগুলো অনেক আগে থেকেই চলে আসছে, পাকিস্তান আমল থেকে এ সমস্যাগুলো বিদ্যমান। যেগুলোর সমাধান কোনো সরকারই করতে পারেনি। সেই সমস্যাগুলো সমাধানের যে অগ্রগতি দরকার, সেই অগ্রগতির ধারা যদি এ সরকার সূচনা করে দিয়ে যেতে পারে তবেই ভবিষ্যৎ ভালো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কারকাজ শেষ হতে বছর তিনেক সময় লাগবে। সংস্কারকাজ বলতে চূড়ান্ত সংস্কার কাজ নয়। অচল অবস্থাকে সচল করার জন্য যে সংস্কার প্রয়োজন, তা তারা করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত