সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব জামায়াতের

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:৫৯ এএম

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা চালু করা, সংবিধানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করাসহ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ৪১ দফা প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। দলটি সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যাপক সংস্কারের’ পক্ষে মত দিয়ে এসব প্রস্তাব করেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। এ সময় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে আইন ও বিচারবিষয়ক সংস্কার; সংসদবিষয়ক সংস্কার; নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার; আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সংস্কার (পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব); জনপ্রশাসন সংস্কার; দুর্নীতি ও সংবিধানবিষয়ক সংস্কার; শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্কার; সংস্কৃতি সংস্কার; পররাষ্ট্রবিষয়ক সংস্কার ও ধর্ম মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংস্কার।

অনুষ্ঠানে ৪১টি প্রস্তাবের বিস্তারিত না তুলে ধরে সংক্ষেপে শুধু ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের অর্থনীতি বা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নির্বাচনে আসা বা না আসার বিষয়টি কীভাবে সুরাহা হবে, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়নি। তবে বিস্তারিত প্রস্তাবে ‘অনেক কিছুই’ আছে বলে জানিয়েছেন দলটির আমির।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘শেখ হাসিনা ও তার দোসররা, যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’ আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘২০১৪, ’১৮ ও ’২৪ সালে আওয়ামী লীগ কি নির্বাচন চেয়েছিল? তারা যদি নির্বাচনে আসতে না চায়, তাহলে তাদের কীভাবে নিয়ে আসবে; তাদের ওপর নির্বাচন চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে কি না, তা জনগণ ঠিক করবে।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি গত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। নিহত ও আহতদের জন্য দোয়া কামনা করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ।

সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। বিচার বিভাগ সংস্কার করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আইন কমিশন গঠন করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠন করতে হবে। তিন বছরের মধ্যে (সর্বোচ্চ পাঁচ বছর) মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সংসদে বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। এক দিনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। কোনো সরকারি চাকরিজীবী অবসরের তিন বছরের আগে সংসদ নির্বাচন করতে পারবেন না। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে হবে। পুলিশে ধর্মীয় শিক্ষা চালু করতে হবে। রিমান্ডে নেওয়ার সময় পরিবারের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। র‌্যাবের সংস্কার করতে হবে, যাতে বাহিনীর প্রতি আস্থা ফিরে আসে। যারা আগে এ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের রাখা যাবে না।’

ডা. তাহের বলেন, ‘জনপ্রশাসনে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারি চাকরিতে আবেদন বিনামূল্যে করতে হবে। কোনো ফি রাখা যাবে না। আগামী দুই বছরের জন্য চাকরিতে ৩৫ বছর, পরে স্থায়ীভাবে ৩৩ বছর এবং অবসরের বয়সসীমা ৬২ বছর করার প্রস্তাব করছি। চাকরিতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে। যারা চাকরিতে থেকে দুর্নীতি ও অন্যায় করেছেন, তাদের বহিষ্কার করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। এক ব্যক্তি পরপর দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সব শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও মহানবী (সা.)-এর জীবনী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতির সংস্কার করতে হবে। প্রাণীর মূর্তি নির্মাণ না করে দেশি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বিগত সরকারের আমলে সম্পাদিত চুক্তি রিভিউ করতে হবে। এজন্য একটি রিভিউ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। বাংলাদেশকে আসিয়ানের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশন যাতে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। হজ ও ওমরাহর খরচ কমানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সব ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, আ ন ম শামসুল ইসলাম, এটিএম মাছুম, সাইফুল আলম খান মিলন, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নূরুল ইসলাম বুলবুল, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।

এর আগে গত ৫ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। বৈঠক শেষে দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ সরকার একটা নির্দলীয় সরকার। তারা দেশ শাসনে আসেনি। দেশ শাসনের সুষ্ঠু পথ বিনির্মাণের জন্য তারা এসেছে। গত তিনটা নির্বাচনে জাতি বঞ্চিত হয়েছে। আগামীতে জাতির সামনে একটা গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া তাদের মূল কাজ। সেজন্য মৌলিক বিষয়ে তাদের কিছু সংস্কার করতেই হবে। কী কী মৌলিক বিষয়ে সংস্কার করা উচিত, সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি।’

তিনি বলেছিলেন, ‘কী কী সংস্কার এই মুহূর্তে প্রয়োজন, সে বিষয়গুলো জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। আমরা সংস্কারের জন্য সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে চাই। সেই যৌক্তিক সময়টা কী হবে, তা নিয়ে আমরা কাজ করব। আমরা সামনে এগোতে চাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত