গাড়ি চলে না চলে না

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:১৯ এএম

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা। রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক কাকরাইল মোড়। এখানে ট্রাফিক সদস্য মোস্তাক হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করছেন। কিন্তু তার ইশারা যেন কেউ শুনছেই না। যে যার মতো করে চলছে তো চলছেই। রিকশা হাত দিয়ে থামালে বাস চলে যাচ্ছে, আবার বাস থামালে মোটরসাইকেল চলে যাচ্ছে। দিশেহারা হয়ে ট্রাফিক পুলিশের ওই সদস্য অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন সড়কে চলাচল করা গাড়িগুলোর দিকে। যানবাহনের এ বেপরোয়া চলাচলের কারণে রাজধানীর প্রধান সড়কে দেখা দেয় তীব্র যানজটের। এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা চার দিনের ছুটি কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে গতকাল তীব্র যানজট দেখা গেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ট্রাফিক পুলিশেও পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগে। এক পাশে ঢাকার রাস্তায় লোকাল বাসের চাপ, অন্যদিকে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, রিকশা ও অটোরিকশা। সবমিলিয়ে নতুন করে পদায়ন পাওয়া ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সড়কের অবস্থা বুঝতেই কষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া এক লাইনের একই পরিবহনের রেষারেষি, অফিস শুরু ও শেষে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ, যেখানে সেখাসে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, সড়কে অবৈধ প্রাইভেট কার পার্কিংসহ নানা প্রতিবন্ধকতা তো রয়েছেই।

ডিএমপির ট্রাফিকবিষয়ক গবেষক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কে আগের চেয়ে আরও ভালোভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তবে সমস্যা হলো আগের মতো আইন প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। মেইন সড়কে অটোরিকশা উঠে পড়ছে, পুলিশ বাধা দিলে ১০-১২ জন মিলে পুলিশের সঙ্গে বাগ্বিত-ায় জড়াচ্ছে। বাস ও প্রাইভেট গাড়ির চালকরা আইন মানছে না, আবার মামলা দিলে নানা কথা বলছে। এসব কারণে অস্বস্তিতে পড়ছে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তিনি আরও বলেন, ট্রাফিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বদলি হলেও মাঠপর্যায়ে তেমন কোনো বদলি হয়নি। তাই নতুন করে ডিএমপির সড়ক বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তবে বর্তমানে গাড়ির চালকদের চেয়ে যাত্রীরা বেশি উল্টাপাল্টা করেন। কেউ কেউ গায়ের জোর দেখান। তাই সবার আগে সাধারণ নাগরিকদের সচেতন হতে হবে।

ডিএমপির ট্রাফিক সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপিতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন যানবাহনকে ৫ হাজার ৭৮১টি মামলা করা হয়েছে। এ সময় জরিমানা করা হয় ২ কোটি ৩৫ লাখ ৬৪ হাজার ৬২৫ টাকা এবং অবৈধভাবে পার্কিং করায় ১ হাজার ৮৮০টি গাড়ি ডাম্পিং ও রেকার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১ অক্টোবর ৮৮২টি গাড়িতে মামলা ও ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা, ২ অক্টোবর ৯৭২টি মামলা ও ৩৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা জরিমানা, ৪ অক্টোবর ৭৪৯টি মামলা ও ৩০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জরিমানা, ৫ অক্টোবর ৬২৭টি মামলা ও ২৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা, ৬ অক্টোবর ১ হাজার ১৭টি মামলা ও ৪০ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা, ৭ অক্টোবর ৮৫৭টি মামলা ও ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ৬২৫ টাকা জরিমানা ও ৮ অক্টোবর ৬৭৭টি মামলা ও ২৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় রাজধানীর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করার অভিযোগে।

সড়কে ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় থাকলেও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন। নির্ধারিত ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, এলোমেলোভাবে গাড়ি চালানো, পারমিটবিহীন গাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রধান সড়কে অটোরিকশার দখলসহ দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের ওপর চড়াও হওয়াসহ এমন নানারকম অনিয়ম সড়কে এখন হরহামেশাই চোখে পড়ছে। এতে রাজধানীর সড়কগুলোতে দিনভর তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালে ট্রাফিকের ক্ষতিগ্রস্ত বক্সগুলো এখনো মেরামত বা নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে এসব এলাকায় ট্রাফিকের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও দেখা পাওয়া যায়নি। তবে ট্রাফিক সার্জেন্ট, পুলিশ সদস্যদের কমবেশি সব মোড়েই দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

একাধিক ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, তাদের এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। তারা সড়কে সক্রিয় থাকলেও আগের মতো কাজে এখনো ফিরতে পারেননি। ফলে এ সুযোগটা নিচ্ছে অনেকে। বিশেষ করে মোড়ে মোড়ে অটোচালকদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, হাতিরঝিল, মগবাজার, কাকরাইলসহ বেশ কিছু ট্রাফিক পয়েন্ট সরেজমিন দেখা যায়, নির্ধারিত সিগন্যাল না মেনে অনেক যানবাহন চলাচল করছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশমুখ বন্ধ করে মোড়ে মোড়ে রিকশা, অটোরিকশা ও ছোট ছোট যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব কারণে অলিগলিতে গাড়ির জটসহ প্রধান বড় বড় সড়কে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়। ট্রাফিক আইন না মানলে জরিমানা বা কেস ফাইল করা, এমন কোনো কিছুতেই তৎপর হতে দেখা যায়নি দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তাদের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় ছোট গাড়ির সংখ্যা পর্যাপ্ত বেড়েছে। দিনে-রাতে সবসময় অটোরিকশা চলছে। তারা অতি দ্রুত ও কোনো নিয়ম না মেনেই চলছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তারা মানছে না। তাদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কেও কোনো জ্ঞান নেই। বর্তমানে এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আনাই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে পড়ছে। আবার ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও নতুন মুখ হওয়ায় নগরীর যানজট নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাঠে আমাদের সদস্যদের কোনো কমতি নেই। আগে প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে যে কজন দায়িত্ব পালন করতেন, এখনো ঠিক সেই কজনই দায়িত্ব পালন করছেন। তদারকিরও কমতি নেই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সমস্যা হলো আমাদের আগের মতো নিয়ন্ত্রণ নেই। এজন্য আগের মতো আইনও প্রয়োগ করতে পারছি না। যেমন, অনেক গাড়ি আগে সড়কে চলত না, সেগুলো এখন চলছে। পারমিট আছে কি না, সেটাও চেক করতে গেলে নানা টালবাহানা করছে।

মহাসড়কে তীব্র যানজট : আমাদের নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা চার দিনের ছুটি কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে বেড়েছে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ। এতে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকে মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ভোগান্তির অন্ত নেই। পাশাপাশি টিকিট কাউন্টারগুলোতে যানবাহনের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের হাইওয়ে থানার ওসি কাজী ওয়াহিদ মোর্শেদ জানান, টানা ছুটি কেন্দ্র করে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ ছিল অনেক বেশি। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ এলাকায় খানাখন্দের কারণে যানবাহনগুলো যথাসময়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থান যেতে পারছিল না। এর ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা সড়ক ও জনপথ বিভাগকে বলে কিছুটা অংশ মেরামত করিয়েছি। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি সরু হওয়ায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে যানজট নিরসনে আমরা কাজ করছি। দুপুরের পর থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত