১৭ হাজার কর্মীর টাকা ফেরতের দায় নিচ্ছে না কেউ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৩০ এএম

চলতি বছরের মে মাসে বন্ধ হওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য ফের খুলছে। প্রথম ধাপে ১৮ হাজার শ্রমিক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। সম্প্রতি ঢাকায় সংক্ষিপ্ত সফরে এসে এ ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে গত ৩০ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার আগে ফ্লাইট জটিলতার কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দিতে না পারা ১৭ হাজার কর্মীর বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, সব শর্ত পূরণ করা থাকলে এই কর্মীরা নতুন করে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এমন পরিস্থিতিতে ওই ১৭ হাজার কর্মীর টাকা ফেরতের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যেতে এসব কর্মী মাথাপিছু অন্তত ৫ লাখ টাকা করে দিয়েছিলেন রিক্রুটিং এজেন্সিকে। সে হিসাবে তাদের পাওনা টাকার পরিমাণ প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা, যা ফেরত পেতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন আটকে পড়া এসব কর্মী, ধরনা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রা (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস) নেতাদের কাছেও। কিন্তু মিলছে না কোনো সুফল। বায়রা জানিয়ে দিয়েছে, এ টাকার দায় নেবে না। যারা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে এ অর্থ নিয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হবে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে শ্রমিক সংকটের জন্য দায়ী প্রায় ১ হাজার ১০০ অনুমোদনহীন এজেন্সির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে শ্রমিকদের পাওনার ইস্যুটি কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যে একটি চক্র মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংস করার চেষ্টায় নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এতে মালয়েশিয়ার সম্ভাব্য নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশি শ্রমিক নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অথচ রেমিট্যান্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মালয়েশিয়া অষ্টম থেকে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। মালয়েশিয়ার জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে মালয়েশিয়া সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে অনুমতি পাওয়া ১৬ হাজার ৯৭০ জন কর্মী দেশটিতে যেতে পারেননি। কর্মীপ্রতি কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা হিসেবে ৮৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা আটকে আছে। এই অর্থ ফেরতের জন্য দুই দফা সময় বেঁধে দেওয়া হলেও এখনো বহু কর্মী তাদের অর্থ বুঝে পাননি। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ‘মালয়েশিয়া যেতে না পারা কর্মীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ না নিয়ে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির (অনুমোদনহীন) কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। অর্থ ফেরত প্রক্রিয়ায় সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সম্পৃক্ত করা না গেলে শ্রমিকদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’

ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়া যেতে না পারা শ্রমিকদের দায়-দেনা পরিশোধ করে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অবহিত করবে। এ ছাড়া গত ২৬ সেপ্টেম্বর বহির্গমন ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীদের দায়-দেনা পরিশোধের তথ্য ১০ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত ছকে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। কিন্তু তা এখনো পাঠানো হয়নি।

জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ-বাণিজ্যে জড়িত ১০টি সিন্ডিকেটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী ছিলেন বায়রার শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক এক নেতা। তিনি মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাণিজ্যের জন্য নিজেই গড়ে তুলেছিলেন একটি মেডিকেল সেন্টার। প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোয় যে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সি সংশ্লিষ্ট ছিল তার মধ্যে পরিচয় লুকিয়ে কমপক্ষে দুটির লাইসেন্সই বায়রার সাবেক ওই নেতার। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও রয়েছে তার এজেন্সি। গত ৩১ মে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর তিনিসহ আরও কয়েকজন মিলে আবার চেষ্টা করছেন মালয়েশিয়ায় ‘ভিন্ন ফর্মুলায়’ কর্মী পাঠানোর শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠনের। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাধর কিছু নেতার সঙ্গে তাদের কয়েকজনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মোটা অঙ্কের অর্থ স্পন্সর করার সূত্রে ওই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পান বায়রার এ সাবেক নেতা ও তার কয়েক সহযোগী। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়া ও নানা সংকটের জন্য দায়ী বায়রার সাবেক এ নেতা।

বায়রার একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে লাভবান সাবেক ওই নেতা। তিনি নিজের লাইসেন্স সরাসরি ব্যবহার না করে অন্যের নামে ব্যবসা করছেন। অন্য যারা ব্যবসা করেন তাদের লাইসেন্স একটা, অথচ উনার লাইসেন্স দুটি।’

একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক অভিযোগ করে বলেন, একটি অসাধু চক্রের অপতৎপরতার কারণে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বার্তা যাচ্ছে। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো শুধু একটা টিকিট কেটে শ্রমিকদের কাছ থেকে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা নিয়েছে। অথচ তারা আইনের আওতায় আসছে না। মন্ত্রণালয়ের নজরে আসছে না। একদিকে তারা বলছে, মাথাপিছু ছয় লাখ টাকা করে শ্রমিক গিয়েছে, আবার বলছে তারা দেড় লাখ টাকা করে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দিয়েছে। অনুমোদিত এজেন্সিগুলো ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে এলোকেশন, জব, ডিমান্ড লেটার, সত্যায়ন, ভিসা করানো, বিটিএমইএর ক্লিয়ারেন্স, নিয়োগ অনুমতি ও বহির্গমনসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাজ সম্পাদন করেছে। আর সহযোগী এজেন্সিগুলো ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার একটি টিকিট করে সাড়ে চার লাখ টাকা করে নিয়েছে। এসব তথ্য গোপন রেখে তারা নানা অপপ্রচার করছে।

আরেকজন জনশক্তি রপ্তানিকারক বলেন, সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের জন্য বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৬ জন শ্রমিক মালয়েশিয়া গেছে। চলতি বছরের শুরুতে শ্রমিক পাঠানোর প্রথম থেকেই মন্ত্রণালয় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। পরে দেখা যায়, প্রতিবেশী সব দেশ মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর উৎস দেশ হওয়ায় এবং হজ মৌসুমের কারণে বিমানের টিকিট সংকট দেখা দেয়। এ কারণ অনেক শ্রমিক যেতে পারেনি।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে ২০২১ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এর আওতায় ২০২২ সালের ২ জুন বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং মিটিংয়ে অনলাইনভিত্তিক স্বচ্ছ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সরবরাহ করা এজেন্সি থেকে সীমিতসংখ্যক এজেন্সি নির্বাচিত করা হয়। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ১ হাজার ৫২০টি বৈধ লাইন্সেসের মধ্যে থেকে মালয়েশিয়া সরকার প্রথমে ২৫টি ও পরে ১০১টি লাইন্সেন্স তালিকাভুক্ত করে। এজেন্সিগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ান সরকারের সফটওয়্যার সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয় বরাদ্দ পদ্ধতি অনুসরণ করে কর্মী নিয়োগের কোটা বরাদ্দ করা হয়। কোটার অনুকূলে বাংলাদেশ হাইকমিশন ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন এবং মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ অনুমতির পর কর্মীদের মেডিকেল, কলিং ভিসা ও ই-ভিসা সংগ্রহ করা হয়। পরে বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র প্রাপ্তির পর কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বরাদ্দ পাওয়ায় ভিসা কেনার প্রয়োজন হয়নি। বরাদ্দপ্রাপ্ত কোটার কর্মীদের নির্ধারিত পদ্ধতিতে পাঠানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনুমোদনহীন এজেন্সিগুলো কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ ও ভিসা ক্রয়বাণিজ্য গোপন করতে অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও করছে। তালিকাবহির্ভূত প্রায় ১ হাজার ১০০ মধ্যস্বত্বভোগী অনুমোদনহীন এজেন্সি নিয়োগকারীর কাছ থেকে ডামি ডিমান্ড লেটার ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ায় অভিবাসন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২২ মাসে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন। এই অভিবাসী শ্রমিকরা দেশের জন্য গত তিন বছরে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। নতুন করে দেশটির শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে রেমিট্যান্স আসা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন জনশক্তি রপ্তানি খাত-সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বায়রার সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোবারক উল্লাহ সুমন বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় যারা যেতে পারেননি তাদের মধ্যে থেকে চার হাজারের মতো অভিযোগ এসেছে। আর বিভিন্ন সময়ে আরও ১২ হাজারের বেশি শ্রমিক যেতে পারেনি। সব মিলিয়ে ১৬ হাজারের মতো শ্রমিক যেতে পারেনি মালয়েশিয়ায়। এসব ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও বায়রা তদন্ত করছে।’

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংসে ভূমিকা রাখা কোনো কোনো এজেন্সির আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আসছে। তবে তারা যেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকে আমরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। সরকারও বিষয়টি ওয়াকিবহাল।’

এ প্রসঙ্গে বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কারণে আজ শ্রমবাজারের এ অবস্থা। আগে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। যেসব শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি তাতে কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। গত ১৬ বছর এসব অপরাধ করে আসছিল প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত