গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানসিকভাবে বেশ চাঙ্গা রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আগের চেয়ে সুস্থবোধ করলেও এখনো শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল। বিএনপি তার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও দীর্ঘ ভ্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় ছাড়পত্র দিতে রাজি নন চিকিৎসকরা। ফলে তার বিদেশযাত্রা আপাতত হচ্ছে না।
বিএনপিসংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চেয়ারপারসনের জন্য আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধাসহ চার্টার্ড এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বুকিং করা রয়েছে। তার জন্য দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড অনুমতি দিলেই বাকি কাজ দ্রুত শেষ করা হবে।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন রোগীকে বিমানে করে নিতে হলে অক্সিজেন লেভেল, রক্তচাপ প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় চিকিৎসকরা ছাড়পত্র দেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকরাও তার জন্য গঠিত বোর্ডে যুক্ত রয়েছেন। তারা অনুমতি দিলেই তাকে বিদেশে নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চিকিৎসা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে ভালো হয়। চিকিৎসকরা তিনটি দেশের সঙ্গেই কথা বলে রেখেছেন। ভ্রমণ ও স্বাস্থ্য বিবেচনায় চেয়ারপারসনের জন্য যে দেশ ভালো হবে, সেখানেই নেওয়া হবে।’
এর আগে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, চেয়ারপারসনকে বিদেশে নেওয়ার দীর্ঘ জার্নির বিষয়ে তার প্রস্তুতির বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। মেডিকেল বোর্ড বলেছে, যুক্তরাজ্যে নিতে হলে ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আর যুক্তরাষ্ট্রে নিতে হলে ১৮ থেকে ২১ ঘণ্টা লাগে।
ফ্লাইংয়ের জন্য শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বিমানে চড়ার নেগেটিভ প্রেশার সহ্য করার মতো শারীরিক অবস্থা এখনো খালেদা জিয়ার হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দুটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। তার শারীরিক সুস্থতা ফ্লাইংয়ের মতো হলেই বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখা হবে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট ‘বন্দি’ খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, হার্ট, চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। ২০২১ সালের নভেম্বরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিচ্ছিলেন চিকিৎসকরা। তার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকেও তৎকালীন সরকারের কাছে বারবার আবেদন-নিবেদন জানানো হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার তা উপেক্ষা করেছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হন। ২৫ মাসেরও বেশি কারাবন্দি ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ এক নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে ছয় মাস পরপর তার সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্দেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। পর দিন ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে ভিডিও বার্তায় বক্তব্য রাখেন খালেদা জিয়া।
সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপির প্রথম পছন্দ যুক্তরাজ্য। সেখানে নেওয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে। আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধাসহ চার্টার্ড এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়েছে। দুবাইয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্স বুকিং করা হয়েছে। চিকিৎসকদের অনুমতি পেলেই খালেদা জিয়াকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রস্তুতির বিষয়াবলি দেখতে দেশে এসেছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ ইউকের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নসরুল্লাহ খান জুনায়েদ। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখতেও গিয়েছিলেন। ওই সময় খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের বউ শর্মিলা রহমান সিঁথিও দেশে এসেছিলেন। লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি দেখতেই তারা এসেছিলেন। ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই লন্ডনের মরফিল্ড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চোখের অপারেশন হয়। সেখানে হাঁটুরও চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি।
সূত্র বলছে, মুক্তি পাওয়ার পর খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা অল্প ভ্রমণে গিয়ে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে পরে দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার চিন্তা করেছিলেন। পরে তা স্থগিত করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। সর্বশেষ যুক্তরাজ্যকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন।
জানা গেছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও অনুষঙ্গিক অনেক কাজ এখনো বাকি। তিনি পাসপোর্ট পেলেও ভিসার জন্য আবেদন করেননি। পরে করবেন। টিকিট বুকিং দেওয়া হয়েছে। দিনক্ষণ নির্ধারণ করে তা পেছানোও হচ্ছে।
পারিবারিক সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়ে মানসিকভাবে স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন খালেদা জিয়া। শরীর ভালো থাকলে বই, পত্রিকা ও টেলিভিশন দেখে সময় কাটান। দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা প্রায় প্রতিদিন তাকে দেখতে বাসায় যান। বিদেশে ছেলে, নাতনিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। দলের লোকজনও তার সঙ্গে দেখা করতে যান, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা ভেবে তারা কমই দেখা করেন। প্রায় প্রতিদিন চিকিৎসকরা বাসায় যান। গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ ক্যাথেরিন কুক তার সঙ্গে দেখা করে স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছেন। গত সপ্তাহে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অস্ট্র্রেলিয়ায় যাওয়া আগে তার সঙ্গে দেখা করেছেন।
