দেশে উচ্চশিক্ষার পথে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাপ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং হায়ার সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা। এ দুই ধাপে যে শিক্ষার্থীর ফল যত ভালো, সেই শিক্ষার্থী পরবর্তী ধাপে উচ্চশিক্ষায় সচরাচর তত বেশি এগিয়ে থাকেন। উচ্চশিক্ষায় কে কতটা ভালো করবে তার অনেকটা নির্ভর করে এই ভিত্তির (এসএসসি ও এইচএসসির ফল) ওপর। তবে করোনা মহামারীর পর থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ ভিত্তিটা অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। যার অন্যতম উদাহরণ চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা। এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে ও সময়ে নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে এবার এইচএসসিতেও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পাশাপাশি সব পরীক্ষায়ও অংশ নেয়নি তারা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুর্বল ভিত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে এসব শিক্ষার্থীর জন্য। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও তার প্রভাব পড়তে পারে।
গত ৩০ জুন ২০২৪ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। রুটিন অনুযায়ী আট দিন পরীক্ষা হওয়ার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশ জুড়ে অস্থির পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাইয়ের পরের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর আরও তিন দফায় বাকি থাকা পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে সরকার। এরপর স্থগিত পরীক্ষাগুলো এক মাস পর শুরুর ঘোষণা দেওয়া হলেও তা আর হয়নি। বরং শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় সরকার। শিক্ষা বিভাগ রাজি না থাকলেও সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পরীক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও ঘেরাও করলে পরীক্ষাগুলো বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। মাঝপথে বাতিল হওয়া এ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে আজ মঙ্গলবার। এদিন বেলা ১১টায় নিজ নিজ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা এ ফল প্রকাশ করবেন। এ পরীক্ষার ফল তৈরি হবে সাবজেক্ট ম্যাপিং পদ্ধতিতে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির দায়িত্বশীল একজন জানিয়েছেন, যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে, সেগুলোর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা হবে। আর যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফল প্রকাশ করা হবে এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। বিষয় ম্যাপিংয়ের জন্য একটি নীতিমালা আছে। এ প্রক্রিয়ায় একজন পরীক্ষার্থী এসএসসিতে একটি বিষয়ে যত নম্বর পেয়েছিলেন, এইচএসসিতে সেই বিষয় থাকলে তাতে এসএসসিতে প্রাপ্ত পুরো নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় বিষয়ে ভিন্নতা থাকলে বিষয় ম্যাপিংয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নম্বর বিবেচনা করে ফল প্রকাশ করা হবে।
এর আগে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ২০২২ সালের ১৯ জুন এসএসসি পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সিলেটসহ কয়েকটি অঞ্চলে তখন বন্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হওয়ায় পরীক্ষায় পিছিয়ে দেয় সরকার। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর সংশোধিত ও পুনর্বিন্যাস করা সিলেবাসে ৩ ঘণ্টার পরিবর্তে ২ ঘণ্টা পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। নৈর্ব্যক্তিক বা এমসিকিউ ২০ মিনিট ও লিখিত ছিল ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের। ২০২২ সালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তারাই এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেয়।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মবের ফাঁদে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। পরিবর্তিত পরিস্থিতি হলেও শিক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়ায় এসব শিক্ষার্থীর ভিত্তি অনেক দুর্বল হবে। যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের তা নিজ দায়িত্বেই পূরণ করতে হবে। অন্যথায় ভালো বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে না পারার হতাশায় অনেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু হলেই শিক্ষা সংক্ষিপ্ত করার প্রবণতা চললে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরি।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুটি পরীক্ষাই সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এবং এইচএসসি পরীক্ষা সম্পূর্ণ না করায় তাদের ভিত্তিটা অবশ্যই দুর্বল। বিশেষ করে এইচএসসির বাকি পরীক্ষাগুলো না নিয়ে বাতিল করা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। বলা যায়, একটা মবের কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো। এতে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের লার্নিং গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এখন যেভাবে তাদের ফল দেওয়া হবে এটা শুধু একটা ফল। তখনই তারা বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবে, যখন তারা উচ্চশিক্ষার পথে যাবে, বিশ^বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দেবে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এবং বুয়েট তাদের ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করে না (ছাড় দেয় না)। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।’
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘আরেকটা বিষয় হচ্ছে যারা প্রকৃতপক্ষে ভালো ছাত্র তারা পরীক্ষা দিয়েই ভালো করতে চায়। এখন সেটা না হওয়ায় তাদের তো লাভ হয়নি বরং পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখানে দুর্বল ছাত্ররা লাভবান হবে। ঢালাওভাবে একটা রেজাল্ট তৈরি হবে। যেটি উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা সিরিয়াসলি নিতে হবে। কিছু হলেই শিক্ষাকে সংক্ষিপ্ত করার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা বের করে হলেও যথাযথভাবে শিক্ষার ধাপ শেষ করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডও দুর্বল হয়ে যাবে।’
একই ধরনের মত দেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসএসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পথে হাঁটেন শিক্ষার্থীরা। এইচএসসি শেষ করে তারা যখন ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাবেন, ভিত্তি দুর্বল হওয়ার কারণে তারা পিছিয়ে পড়বেন। কেননা ভর্তি পরীক্ষায় সিলেবাস সংক্ষিপ্ত হয় না। যারা নিজেদের তাগিদে পুরো সিলেবাসটা শেষ করবে তারা এগিয়ে যাবে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। পুরো শিক্ষাজীবনে এটার একটা প্রভাব পড়তে পারে। আমাদের শিক্ষাটা আরও ঢেলে সাজাতে হবে। অনেক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। সে অনুযায়ী সরকার কাজও শুরু করেছে।’
