পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঋণ কেলেঙ্কারি থেকে দেশের আর্থিক খাতকে বাঁচাতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইতিমধ্যে ভেঙে দেওয়া হয়েছে ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ। এসব ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আদায় নানা ধরনের শঙ্কা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত সহায়ক জামানত নেই। এমন পরিস্থিতিতে যেসব ঋণধারীর পর্যাপ্ত জামানত পাওয়া যাবে না সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ঋণ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন হওয়া দুটি ব্যাংক।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠিত পর্ষদ এমন প্রস্তাবনা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানায়, ইউসিবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পক্ষে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শরীফ জহীর জানান, অন্তর্বর্তী সরকার কম সময়ের জন্য। এখন যদি কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়, তখন বাধা আসবে এবং সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের সহযোগিতা থাকবে কি না। যদি সহযোগিতা চলমান থাকে তবে সামনে কঠোর হস্তে সব অনিয়ম দূর করতে বোর্ড কাজ করবে। বিশেষ করে যারা ঋণের নামে অর্থ লুট করেছেন তাদের বন্ধকী অর্থ ছাড়াও অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই সরকারের শেষ দিকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংকটির মালিক এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণের অর্থ পাচার করা হয়। এসব উদ্ধারে উদ্যোগ জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর উদ্যোগ নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা সংশোধন করে শতভাগ আইনি সহযোগিতা প্রয়োজন। গভর্নর এ বিষয়ে আশ্বাস দেন।
সূত্র আরও জানায়, ব্যাংকের মাধ্যমে অনেক অনিয়ম হয়েছে। খেলপি ঋণ গোপন করা হয়েছে। খেলাপি ৪-৫ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃত খেলাপি অনেক বেশি। বেশি খেলাপি দেখালে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রচুর পরিমাণে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এতে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। তবে হিসাব গোপন করলে ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র জানা যাবে না।
এ সময় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর প্রকৃত হিসাব মেনে চলার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে নতুন করে অডিট করার বিষয়েও নির্দেশনা দেন গভর্নর। এমনকি খেলাপি এবং বন্ধকী সম্পদসহ সব হিসাব ঠিক করে প্রকৃত ব্যালেন্স শিট তৈরির কথা জানান এবং প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় খেলাপির বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণে ছাড়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন গভর্নর।
বৈঠক শেষে ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির গণমাধ্যমে বলেন, আমাদের ব্যাংকে দিনদুপুরে লুট হয়েছে। বিগত সরকারের শেষের দিকে মাত্র ৩-৪ দিনে ৪০০ কোটি ডলার পাচারের তথ্য মিলেছে। এতে কিছু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও জড়িত। আগামীতে তারা কাজে বাধা দিতে পারেন এমন শঙ্কা রয়েছে। তবে ব্যাংক আইন অনুযায়ী চলবে। তার আগে ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র জানা দরকার। ইতিমধ্যে কিছু কাজ হয়েছে। সামনে কঠোর হলেও ব্যাংক ঠিক করা হবে। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ইউসিবির প্রতিনিধি অন্যদের মধ্যে ছিলেন পরিচালক মো. তানভীর খান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. ইউসুফ আলী ও হিসাববিদ ওবায়দুর রহমান, এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ।
এদিকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খাজা শাহরিয়ার ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা গভর্নরের কাছে তুলে ধরেন। এ সময় তিনি খেলাপি ঋণ আদায় এবং বন্ধকী সম্পদের হিসাবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। খেলাপি আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগে নানা অনিয়ম তুলে ধরে চেয়ারম্যান খাজা শাহরিয়ার জানান, ব্যাংকটির জনবল প্রায় ৬ হাজার, যার মধ্যে ২ হাজার ৭ জনের নিয়োগে সার্কুলার, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালের পরে শুধু এস আলম এবং চট্টগ্রামের পরিচয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের নিয়ে কাজ করা কঠিন। এ সময় এমডিও যদি অনিয়মে নিয়োগ পেয়ে থাকেন, তাহলে তাকেও বরখাস্তের নির্দেশ দেন গভর্নর। আহসান এইচ মনসুর সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সূত্র জানায়, আল আরাফা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন গ্যারান্টি, কমিশন এবং রপ্তানি আয়ের ভর্তুকির অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ অর্থ দ্রুত ফেরত পেলে ব্যাংক পরিচালনা সহজ হবে। আর ঘুরে দাঁড়াতে আইন এবং নীতি সহায়তা চেয়েছে প্রতিনিধিদল।
