নগর দর্পণ

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০৯ এএম

১৯৬৫ সালে দৈনিক পাকিস্তানে যোগদান করেন তিনি। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘সুপান্থ’ ছদ্মনামে তার লেখা কলাম ‘নগর দর্পণ’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক এবং অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালের ২৩ জুলাই মারা যান বরেণ্য সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতেই ছাপা হচ্ছে তার লেখা উপসম্পাদকীয়

বিজ্ঞানীরা মহাকাশে দূরতর বস্তুর সন্ধান পাইয়াছেন। আমাদের এই পৃথিবী হইতে ১৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ‘কোয়াসার’ হইতে বিকিরিতি আলোক কণা যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশাল টেলিস্কোপে ধরা পড়িয়াছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, কোয়াসার এক হাজার ছায়াপথ হইতে অধিক উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে। কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত এই কোয়াসার এতই দূরে অবস্থিত যে, উহার আলোক তরঙ্গ পৃথিবীতে যখন ধরা পড়িয়াছে, তখন উহার উজ্জ্বলতা ছিল খালি চোখে দৃশ্যমান বস্তু হইতে চার লক্ষ গুণ কম। এই দূরত্বের ধারণা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কল্পনায়ও আসে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল পথ পরিভ্রমণ করে। এক বৎসরে আলো কত মাইল পথ অতিক্রম করিতে পারে তাহা গুণাঙ্কের মাধ্যমেও আমরা ঠিক ধারণা করিয়া উঠতে পারি না। আমাদের দৌড় বড়জোর এই মৃত্তিকার পৃথিবী। ফলে ১৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে নক্ষত্র পুঞ্জের মধ্যে কী জ¦লিতেছে, কী নিভিতেছে, কী ঘটিতেছে, তাহা বুঝিবার উপাই নাই; কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই বিষয়টি ভালো করিয়া বলিতে পারেন।

আমরা ভালো করিয়া বুঝিতে না পারিলেও এ ধরনের সংবাদ মনের মধ্যে দূরত্বের একটা অনির্দিষ্ট অনুভূতি জাগাইয়া তোলে। এই পৃথিবীর জীবিকার্জনের জন্য সারা দিন হয় ফাইলের মধ্যে মুখ খুঁজিয়া থাকি, নয় খন্ড ইটের দিকে তাকাইয়া থাকি, নয় চাউল ডাউল ওজন করি ইত্যাদি ধরনের নানা কাজে আমরা ব্যাপক আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া তাকাইবার সময়ই পাই না, দূরত্ব, বিশালত্ব কাহাকে বলে, তাহা বুঝিতে পারি না। জীবনের ছোট ছোট খন্ড ক্ষুদ্র অংশ লইয়া আমরা ব্যস্ত, উহার ব্যপ্তি বুঝিবার অবকাশ জীবনের বড় একটা মিলে না। কখনো হঠাৎ করিয়া নক্ষত্র খচিত আকাশ চোখে পড়িলে মন বেদনায় হু হু করিয়া ওঠে; দূরত্বের নির্জনতার ও নিঃসঙ্গতার এক অনুভূতি মনকে ছাইয়া ফেলে জীবনের নৈমিত্যিক কাজগুলোকে তখন অসাড় বলিয়া মনে হয়; আকাশের ওইপারে আকাশ, নক্ষত্রের ওইপারে নক্ষত্র এবং মহাশূন্যের ভরিয়া কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে প্রাণময় পৃথিবীর একাকিত্ব তখন হৃদয়ের মধ্যে এক ধরনের ভয় ধরাইয়া দেয়। আমাদের প্রতিদিনের জীবনাচরণ, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন যে কত তুচ্ছ, কত সীমাবদ্ধ এবং অর্থহীন সেই বিশালত্বের পটভূমিতে তাহা স্পষ্ট কত তুচ্ছ, কত সীমাবদ্ধ এবং অর্থহীন সেই বিশালত্বের পটভূমিতে তাহা স্পষ্ট হইয়া ওঠে। আসলেই কী অর্থহীন?

যদি জীবন এমন না হইত, যদি এই খন্ড ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যে এত যন্ত্রণা না থাকিত, যদি হৃৎপিন্ডের মধ্যে স্পন্দন না থাকিত, যদি সামান্য মানুষ অসামান্য কাজে ব্রতী না হইত, তাহা হইলে ১৪০০ কোটি আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরবর্তী কোয়াসারের কাজে ব্রতী হইত, তাহা হইলে ১৪০০ কোটি আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরবর্তী কোয়াসারের খোঁজ কে লইত? আমরা সামান্য মানুষ বলিয়াই অসামান্যকে বুঝিতে পারি, জীবনে এত কষ্ট বলিয়াই সুখকে চিনিতে পারি, তুচ্ছ বিষয় লইয়া এমন মাতিয়া আছি বলিয়াই সুখকে চিনিতে পারি, তুচ্ছ বিষয় লইয়া এমন মাতিয়া আছি বলিয়াই এমন চমৎকার উপলব্ধি। আর দূরত্বের কথা? কেবলমাত্র নক্ষত্রই যে অনেক দূরে সংক্ষেপিত তাহা নহে, মানুষ মানুষ হইতে যে কত দূরে সে পরিমাপ জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পক্ষেও করা সম্ভব নহে। পাশাপাশি জীবনযাপন করি, মুখোমুখি বসিয়া থাকি, একই শহরে একই দেশে বসবাস করি, কিন্তু এক জীবন দিয়াও পরস্পরকে চিনিতে পারি না। জীবনানন্দ দাশ তাহার এক কবিতায় বলিয়াছিলেন, ‘সচেতনা, তুমি এক দূরতম দ্বীপ।’ দূরতর শুধু নয়, নিতান্ত কাছের মানুষটিকেও কখনো কখনো ১৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের মানুষ বলিয়া মনে হয়।

পাশের বাড়ি

ঢাকা নগরীর ফকিরেরপুল মহল্লার এক গৃহস্থ সপরিবারে পাশের বাড়িতে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। সন্ধ্যায় নহে, গভীর রাত্রিতে নহে বেলা এগারটার দিকে তিনি পাশর্^বর্তী পরিবারের সখ্যের স্বাদ লইতে গিয়াছিলেন। সেই সুযোগে চোর তাহার ঘরের দরজা ভাঙ্গিয়া পাঁচ হাজার টাকার মালামাল ফাঁক করিয়া দিয়াছে। খবরটি গতকালের দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হইয়াছে। উল্লিখিত গৃহস্বামীর পাঁচ হাজার টাকার মালামাল চুরি হইবার খবরে আমরা অবশ্যই বেদনাবোধ করিতেছি, তবে এই সংবাদের ভেতর আরও একটি অত্যাশ্চর্য সংবাদ আছে। প্রতিবেশীর সহিত এই ঢাকা নগরীতে এখনো যে এতটা সুসম্পর্ক আছে এবং পরস্পর পরস্পরের বাড়িতে সকলে মিলিয়া বেড়াইতে যায়, কথাবার্তা আদান-প্রদান করে, হয়তো বা ভালো তরকারি খাবার-দাবারেরও আদান-প্রদান চলে এই সংবাদটি আমাদের কাছে পাঁচ হাজার টাকার অধিক মূল্যবান বলিয়া মনে হইয়াছে। পাশের বাড়ির সহিত সম্ভাব হইবে। দুর্লভ ঘটনাই বলিতে হইবে। এই নগরীতে আমরা নানা ধরনের মানুষ বস্তিতে ফ্ল্যাটে, আবাসিক এলাকায় স্টাফ কোয়ার্টার্সে বসবাস করি, কিন্তু নিতান্ত পাশের বাড়িটি চিরকাল অচেনা রহস্যময় হইয়া থকে, কখনো বা কৌতূহলের আকর। পাশের বাড়ির ছিটাফোঁটা ঘটনা সরস আলোচনার চমৎকার উপজীব্য, পাশের বাড়িটি হয় ঈর্ষা জাগরিত করে, না হয় অনুকম্পা। পাশের বাড়ি হইতে বিরিয়ানির গন্ধ ভাসিয়া আসিলে আমরা অন্তত মনে মনে বলি, খুউব, না? পাশের বাড়ির দৃশ্য ম্রিয়মাণ হইলে এড়াইয়া চলিতে চেষ্টা করি।

নিতান্ত পাশাপাশি বাস করি হয়তোবা বছরের পর বছর ধরিয়া বাস করি, কিন্তু পাস্পরের সহিত বাক্যবিনিময় হয় না, চোখাচোখি ও নহে। পাশের বাড়ির মানুষটিকে এড়াইয়া চলিতে পারিলে আমরা আরামবোধ করি, ইহা যে কী ধরনের মনোবৃত্তি বলিতে পারিব না। হয়বা দশ বৎসর পাশাপাশি বাড়িতে বাস করিয়াছি, প্রতিদিন গলিপথে পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের সহিত দেখাদেখি হইয়াছে, কষ্টে সালাম বিনিময় করিয়াছি কিন্তু কথা হয় নাই। কিন্তু বৎসর দশেক বাদে কোন বিপণিকন্দ্রে কিংবা অন্য কোনো স্থানে আকস্মিকভাবে দেখা হইলে পরম উচ্ছ্বাসে পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিয়াছি। একসঙ্গে সহস্র প্রশ্ন, ছেলেমেয়েরা কেমন আছে, কোথায় আছে, কী করিতেছে, অমুক কেমন বড় হইয়াছে, তখন মনে হইয়াছে পাশের বাড়ির মানুষটি নিতান্ত আপনজন ছিল শুধু সময়মতো কথা হইল না।

বাংলাদেশের রমণী

আমাদের স্টাফ, রিপোর্টার জানাইয়াছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ রমণীর প্রায় গোটা জীবনই সন্তান ধারণ, সন্তান লালন-পালন, স্বামী সেবা এবং ঘরের কাজে কাটিয়া যায়। এসব কাজে তাহার জীবনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ ঘণ্টাই ব্যয়িত হয়। বাংলাদেশের রমণীরা কীভাবে জীবনযাপন করিতেছেন, তাহা বুঝিবার জন্য উল্লিখিত পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। ক্রীতদাসের অধিক শ্রম। চাকরিজীবী রমণী, যিনি হয়তো বা তাহার পুরুষ সঙ্গীর তুলনায় অধিক অর্থোপার্জন করিতেছেন, তাহাকেও সংসারের ভিতর ঢুকিয়া সন্তান সেবা, স্বামী সেবা, আত্মীয়-স্বজন সেবা এবং মাঝে মাঝে সন্তান ধারণ করিতে হয়। না করিলে তিনি নিষ্ঠুর রমণী বলিয়া চিহ্নিত হন। প্রকৃতি কিংবা বিধাতা বৈরী কিনা বলিতে পারিব না, তবে এ কথা স্বীকার করিতেই হবে যে সমাজ সংসারে রমণীরা একটু প্রতিকূল অবস্থানে বিরাজ করিতেছেন। সমাজে এখন পুরুষের প্রাধান্য। এক সময় না কী মাতৃতন্ত্র ছিল, কিন্তু এখন পুরুষতন্ত্র, সুপ্রতিষ্ঠিত, নারী সমাজের পায়ে দ্বিবিধ শৃঙ্খল, একটি সমাজের দারিদ্র্যের শৃঙ্খল আর একটি পুরুষ শাসনের শৃঙ্খলা রমণীরা সুবিধাজনক অবস্থানে নাই বলিয়া নারী সমাজ চিরকাল এভাবে শোষিত হইবে। ইহাও কোনো কাজের কথা নহে। সন্তান ধারণের বিষয়টি অবশ্য প্রাকৃতিক এ বিষয়ে বাগবিস্তার করা সম্ভব নহে, তবে স্বামী সেবা সংসার সেবা গৃহকর্ম ইত্যাদি বিষয়ে পুরুষরা অবশ্যই কিছুটা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হইতে পারেন। পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কর্মজীবী স্বামী-স্ত্রী সংসারের কাজ সমান সমান ভাগ করিয়া লইয়াছে। নারীর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এ ধরনের দাসত্ব হইতে নারীকে মুক্তি দিয়াছে। আমাদের দেশেও নারীর এই দুঃখজনক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিবে, যখন তাহাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ উন্মোচিত হইবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া আর সকল স্বাধীনতা অর্থহীন। তবে তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়। এক্সপ্লয়টেশনের জন্য কিনা বলিতে পারি না তবে জীবন ও সংসারে নারীর একটি ভিন্ন ভূমিকা রহিয়াছে বলিয়াই মনে হয়। সাহিত্য সম্রাট শরৎচন্দ্র এক অর্থে নারীদের সর্বনাশ করিয়া গিয়াছে, তিনি রাজলক্ষ্মীকে দিয়া জুতার ফিতা খুলাইয়াছেন। মধ্যাহ্নে খাইতে বসিয়া রাজলক্ষ্মীর হাতের তাল পাতার পাখার বাতাস সেবন করিয়াছেন শ্রীকান্ত। সযত্নে কখন যে মশারি গুঁজিয়া দিয়া গিয়াছেন শ্রীকান্ত তাহা জানিতে পারেন নাই। চিরকালের মতো চলিয়া যাইবার আগে শীতার্ত ট্রেনের মধ্যে শ্রীকান্তের পায়ের ওপর যথারীতি একখানা কম্বল চাপাইয়া দিয়া গিয়াছিল। বলিতে হয়, শরৎচন্দ্র পুরুষদের হৃদয়ে এসব আকাক্সক্ষা দিয়া গিয়াছেন। এসব কারণেই কবিতার ভাষায় বলিতে ইচ্ছা হয়, মধ্য রাতে কখনো প্রতীক্ষায় দরজায় দাঁড়াবে বলে অচেতন কপালে হাত/কখনো দুপুরে খাবার সাজিয়ে বসে এটা ওটা নিতে বলা। এসব কাঙ্গাল আকাক্সক্ষার বশবর্তী হয়ে/তোমাকেই ভালোবেসে গেছি। ইহা সত্য কথা কিনা, কে জানে, ভালোবাসা এবং এক্সপ্লয়টেশনের মধ্যে ক্ষীণ সুতার দূরত্ব। কেহ বা ভালোবাসিয়া শোষণ করে আবার কেহ শোষণ করিয়া ভালোবাসার কথা বলে।

পাদটীকা

দেশে আবার মাছের রোগ দেখা দিয়েছে শুনিয়া এক গাল হাসিয়া বলিলেন জনৈকি নাগরিক ভালোই হইল, এখন গিন্নিকে বলিতে পারিব, মাছ ক্রয় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

লেখক: আহমেদ হুমায়ূন

২৪/১১/৮৯

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত