রাজপথে বিভিন্ন দাবি আদায়ের কর্মসূচির কারণে অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী। গতকাল সোমবার চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫-এর দাবিতে শাহবাগে এবং স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব মোড়ে সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। এতে রাজধানী জুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। এ ছাড়া জয়দেবপুরে রেলস্টেশনে ১০ দফা দাবিতে মানববন্ধনের কারণে দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে নিয়োগ কেন্দ্র করে দুটি চিকিৎসক সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন আহত হন। দাবি আদায়ের এসব কর্মসূচির কারণে গতকাল নগরবাসীকে পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তি।
শাহবাগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার দাবি : রাজধানীর শাহবাগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগ না ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত তারা শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান করছিলেন। কয়েকশ আন্দোলনকারী সেখানে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মুনসুর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে রাস্তাঘাট স্বাভাবিক রয়েছে, যানচলাচলে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।’
আন্দোলনকারী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আজ এখানে একত্র হয়েছি, আমাদের এক দাবি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ চাই। আমাদের আজকের এটা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি। দাবি আদায় করে তবেই আমরা বাড়ি ফিরব।’
৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে মুক্তি এবং স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে রাস্তা বন্ধ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকালে রাজধানীর নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব মোড়ে তাদের এ কর্মসূচির কারণে গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। সৃষ্টি হয়েছিল যানজট। ‘সাত কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে এ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ইডেন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রূপা বণিক বলেন, ‘আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে মুক্তি চাই। প্রয়োজনে সাত কলেজ নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক, সেজন্য ইউজিসিসহ অংশীজনদের অতি জরুরি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা আর সেশনজটে পড়তে চাই না। চার বছরের কোর্স চার বছরেই শেষ করতে চাই।’
সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টার পর থেকে ঢাকা কলেজের মূল ফটকে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে একটি অংশ নীলক্ষেত মোড়ে এবং আরেকটি অংশ সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরে সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দাবি বাস্তবায়নে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে সড়ক থেকে তারা সরে যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ নিয়ে ড্যাব-এনডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে গত ১৭ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেওয়া ১০ জনের নিয়োগ কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ড্যাব ও জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম বা এনডিএফ। গতকাল এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী টিবি গেটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভবনে এ ঘটনা ঘটে। এতে এনডিএফপন্থি তিন চিকিৎসক আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ড্যাব এসব নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই কর্মকর্তাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দোসর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থানের অভিযোগ এনে অধিদপ্তরসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজের সুযোগ করে দিতে পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এনডিএফ।
জানা গেছে, এদিন সকাল থেকেই অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান নেন ড্যাবপন্থি চিকিৎসকরা। এ সময় তারা সদ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান। অন্যদিকে অধিদপ্তরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে স্বাস্থ্য খাত সচল রাখতে বর্তমান নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজের পথ সুগম করার দাবি জানান এনডিএফপন্থি চিকিৎসকরা। এ সময় দুপক্ষ পরস্পরবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে এনডিএফপন্থি চিকিৎসক ও ড্যাবপন্থি চিকিৎসকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং তা হাতাহাতি পর্যায়ে পৌঁছায়। আন্দোলনকারীদের কিছু অংশ চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়।
এনডিএফপন্থি চিকিৎসকদের দাবি, ড্যাবের সঙ্গে থাকা বহিরাগত সন্ত্রাসীরা রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন ডা. ইমরান হোসাইন, শাহরিয়ার ও যোবায়ের। ডা. ইমরান বিএসএমএমইউর নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক এবং এনডিএফের একজন সদস্য। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ ও বদলিকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে ড্যাব। এর আগে গত রবিবারও ড্যাব অবস্থান কর্মসূচি পালন করে এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিদপ্তরে ঢুকতে বাধা দেয়। অধিদপ্তরে ঢুকতে না পেরে বাইরে থেকেই চলে যান নিয়োগ পাওয়া পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ, উপপরিচালক (হাসপাতাল-১) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটোসহ কয়েকজন। তারা এ সময় সাংবাদিকদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার দাবি করেছেন এনডিএফের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) শাখার সভাপতি ডা. আতিয়ার রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্র্বর্তী সরকার যতদূর সম্ভব যাচাই-বাছাই করে নিরপেক্ষ ও দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এনডিএফের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে সহযোগিতা করা। সেজন্যই তারা কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তাকে কাজে যোগদানের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু আরেকটি সংগঠন এই নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের সন্দেহ হয় তারা বিদায়ী স্বৈরশাসকের দোসর কি না। কারণ ভালো মানুষদের যোগদান করতে দিচ্ছে না। গত রবিবারও এনডিএফ নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজে যোগদানে সহযোগিতা করার জন্য গিয়েছিল। কিন্তু সেদিনও ওই সংগঠন তাদের কাজে যোগ দিতে দেয়নি।
গতকালের ঘটনাকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেছেন ড্যাবের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ডা. মেহেদী হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমাদের কর্মসূচি ছিল পূর্বনির্ধারিত। তাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি তারা ওখানে বসে আছে। আমরা ওদের সেখান থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করি। কারণ তাদের সঙ্গে গন্ডগোলের কোনো সুযোগ নেই। ওরা আমাদের সেখানে যেতে বলে ও কোনো অসুবিধা নেই বলে জানান। এ অবস্থায় সেখানে আমরা যাই। কিন্তু ওদের কিছু ছেলেপেলে ওখানে বসেছিল। এ সময় ধাক্কাধাক্কি হয়।’
আহত হওয়ার ব্যাপারে এই ড্যাব নেতা বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘাত হওয়ার কোনো কারণই নেই। আমরা তো তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই গিয়েছি। ধাক্কাধাক্কির কারণে কেউ সামান্য আহত হতে পারেন। ইচ্ছে করে কোনো আঘাত করা হয়নি। আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করেছি।’
জয়দেবপুরে রেলস্টেশনে মানববন্ধন, দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ : বন্ধ রাখা রেলের মাসিক টিকিট এবং টাঙ্গাইল কমিউটার ও সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস আবার চালু, জয়দেবপুর স্টেশনে সব ট্রেন থামানোসহ গাজীপুর-ঢাকা রেল যোগাযোগ উন্নয়নে ১০ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে একটি সংগঠন। গতকাল সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে এই কর্মসূচি চলার সময় উত্তরাঞ্চলের সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। জয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার হানিফ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় উত্তরের রুটের যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন।’
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট আলাউদ্দিন, গাজীপুর সদর মেট্রো থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান আজমল ভূঁইয়া, শিক্ষক নেতা আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপি নেতা কামরুল হাসান প্রমুখ।
