ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ যাচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে। আজ বৃহস্পতিবার রাত বা আগামীকাল শুক্রবার ভোরের মধ্যে তা উপকূল অতিক্রম করতে পারে। গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়া ঝড়টি আরও ঘনীভূত হয়ে দিনভর পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে। ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়া ঝড়টি আজ শেষ মুহূর্তে গতি বাড়িয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘণ্টায় এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোকাস্টিং কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৪৬ মিনিটে দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘ ঘূর্ণিঝড়টির গতিপথ সম্পূর্ণ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অভিমুখী। ঝড়টি কাল মধ্যরাত থেকে শুক্রবার সকালের মধ্যে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।’
এর প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলে ঝড় বৃষ্টি বা জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঝড়টি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ উপকূল দিয়ে যাচ্ছে তাই এর প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলে জলোচ্ছ্বাস হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে এর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় হালকা বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এদিকে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৬ নম্বর বিশেষ বুলেটিনের তথ্যমতে, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড়টি গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৫৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা থেকে ৫৫৩ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে পশ্চিম উত্তর-পশ্চিমে অগ্রসর হচ্ছে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকা উত্তাল থাকায় মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এজন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার বঙ্গোপসাগরের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটু লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। লঘুচাপটি গত মঙ্গলবার সকালে নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার পর একই দিন রাতে গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়। গতকাল সকাল ৬টায় গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘দানা’। দানা কাতারের দেওয়া নাম, এর অর্থ বিগ পার্ল বা বড় মুক্তা।
বঙ্গোপসাগরে প্রাক বর্ষা মৌসুম (এপ্রিল-মে) ও প্রি বর্ষা মৌসুম (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।। ১৮৯১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত অক্টোবর মাসে বঙ্গোপসাগরে ৯৪টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যে ১৯টি ঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত করা ঝড়গুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ওপর দিয়ে গিয়েছে। গত বছরই বছরের এ সময়ে তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। গত বছরের অক্টোবরে ‘হামুন’, নভেম্বরে ‘মিধিলি’র পর ডিসেম্বরে ‘মিগজাউম’ নামের তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল। চলতি মাসের আবহাওয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও এক থেকে তিনটি লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এদের মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে বলা হয়েছিল। ইতিমধ্যে একটি নিম্নচাপ উপকূল অতিক্রম করেছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি : ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ মোকাবিলার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উপকূলীয় জেলাগুলোর জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে প্রস্তুতি সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। এরই মধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় স্ট্যান্ডিং অরডার্স অন ডিজাস্টার (এসওডি) অনুযায়ী ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন তারা।
গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল নিজ নিজ সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা করেছেন বলে জানিয়েছেন ডিসিরা। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রস্তুত রাখা হয়েছে সিপিপি ও রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম যেসব কার্যক্রম নেওয়া দরকার সেগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনকে ঘূর্ণিঝড়-সংক্রান্ত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
