আমাদের ফ্যাশন মানচিত্রে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ডিজাইন ব্যক্তিত্ব চন্দ্র্রশেখর সাহা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্পে মেধা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। সবসময় অনুসন্ধিৎসু এই ব্যক্তিত্ব একজন গবেষকও। হেরিটেজ টেক্সটাইল নিয়ে তার কাজ শুধু দেশে নয়, বিদেশেও হয়েছে নন্দিত। লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন একাধিক বই। কিউরেটর হিসেবে ছিলেন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। দেশ রূপান্তর অফিসে এলেন সাধারণ পাঞ্জাবি পরে। যেমনটি থাকেন সবসময়। শুরু হলো আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক মোহসীনা লাইজু এবং প্রতিবেদক নিহার সরকার অঙ্কুর। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা
বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র চন্দ্রশেখর সাহা। যার হাত ধরে আড়ংসহ কিছু ফ্যাশন হাউজ দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর মধ্যে আড়ং যাত্রা শুরু করেছে আটাত্তর সাল থেকে। ওই সময় আরও কয়েকটি ফ্যাশন হাউজ কাজ শুরু করে। এর মধ্যে কারিকা, রূপায়ণ, কুমুদিনী ছিল সমসাময়িক। বলা যায়, দেশীয় ফ্যাশন হাউজ যাত্রা শুরু করে সত্তরের দশকে। এই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত ধীরে ধীরে এই কনসেপ্ট ডেভেলপ করে। পর্যায়ক্রমে ২০০০ সালে এসে বলা যায়, মোটামুটি ফ্যাশন হাউজগুলো দাঁড়িয়ে যায়। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ব্র্যান্ড কনসেপ্ট।
ক্যামেরার সামনে আনুষ্ঠানিক কথা বলার আগে জানালেন চারুকলার পাঠ শেষ করে আড়ংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি একাশি সালে। তখন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু। যদিও তার আগেই ডিজাইন নিয়ে নানা রকম চিন্তাভাবনা করছিলাম। পোশাকে বর্ণমালার মোটিফ ব্যবহার করার ধারণা জন্ম নেয় তারও আগে।
তাপস রায়হান চন্দ্রশেখর সাহার উদ্দেশে বললেন আপনাকে মূলত কী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? আপনি চিত্রশিল্পী না গবেষক? মোহসীনা লাইজু মুচকি হেসে মাথা নাচিয়ে বললেন চিত্রশিল্পী, গবেষক, ফ্যাশন শিল্পী, লেখক, সব। এমন কথা শুনে চন্দ্রশেখর সাহা মুচকি হাসলেন। তাপস রায়হান বললেন তাহলে তো আপনি সর্বজনীন! এমন কথা শুনে চন্দ্রশেখর সাহা এবার হো হো করে হাসলেন। বললেন, আমার বহুমাত্রিক পরিচয়।
তাপস রায়হান : আপনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। এই মুহূর্তে কী নিয়ে ব্যস্ততা?
চন্দ্রশেখর সাহা : ব্যস্ততা আমার সারাজীবন। অবসর কম পাই। একটা কাজ শেষ করতে না করতে করতে আরেকটা কাজ মাথার ওপরে। কী করব? ঠিক এই মুহূর্তে কারুশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে যারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেন তাদের ঐতিহ্যগত ভাবনা, পেশাগত দক্ষতা নিয়েই কাজ। বর্তমানে মানুষ কী চায়, কোন শ্রেণির ভোক্তার কেমন চাওয়া, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের সম্পর্ক এখন কার মানুষ কী চায় এসব। যেমন ধরেন, একটা মাটির কলসি ঘট। সে ওটাই জানে। কিন্তু এই মাটির কলসি দিয়ে তো অনেক কিছুই করা যেতে পারে। এটা ভাবার তার প্রয়োজন আছে কী নেই, সেটাও সে ভাবে না। কিন্তু প্রয়োজন আছে। এজন্য যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, ব্যবহারিক জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এটা ছাড়া সে তো আর কিছু জানে না।
এখন ওই পেশা থেকে সাম্প্রতিক হয়ে ওঠার জন্য, অনেক কাজের সহায়তা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং ব্যক্তিগত সহায়তার জন্য আমরা কিছু মাধ্যম নিয়ে কাজ শেষ করেছি। আরও কিছু করব। নিয়মিতভাবে আড়ংয়ে আবার কাজ করছি সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে, শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাশন নিয়ে পড়াই। পাশাপাশি নতুন আরও দুটো পাবলিকেশন নিয়ে কাজ করছি। যখন দেশের সব জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল না, তখন একমাত্র অবলম্বন ছিল হাতপাখা। ঋতু পরিবর্তনের অসহনীয় পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছিল শোয়ার জন্য শীতল পাটি আর বাতাসের জন্য ছিল হাতপাখা। উপকরণভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক যত রকমের হাতপাখা হয়। এটা নিয়ে কাজ আগেও ছিল। এখন ক্যানভাস বাড়িয়েছি। মূলত কারুশিল্পীর সৃজনশীল ভাবনা থেকেই সব পরিবর্তন, ধারণা, দৃশ্যমানতা, ফাংশনালিটি সবকিছুই কীভাবে কার্যকর হবে, তা পরিকল্পিত হয়। প্রতিটি কারুশিল্পের ক্ষেত্রে একই বিষয়। একটি হচ্ছে, কার্যকর দিক। আরেকটি হচ্ছে, উপকরণের মূল বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণœ রাখা এবং ঐতিহ্য ও বংশপরম্পরায় তাদের যে জ্ঞান, তার সংমিশ্রণ এবং ব্যক্তি শিল্পী হিসেবে তার একটা সিগনেচার।
নীহার সরকার অঙ্কুর : আপনার কী মনে হয়, কারুশিল্পে আপনি নান্দনিকতা দেখছেন প্রবল?
চন্দ্রশেখর সাহা : আমার কাজের বয়স প্রায় ৪৩। ওদের সঙ্গে কাজ করার সময় দেখেছি, একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি, ওদের রক্তের মধ্যেই ডিএনএ সেই বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলে। সময়, সুযোগ এবং বিস্মৃতি বিষয়গুলো আপেক্ষিক। এটার অনেক উদাহরণ দিতে পারি। একটা বলি একবার ইউনেস্কোর একটা প্রজেক্টে কাজ করেছিলাম বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের হয়ে। আমি ছিলাম মুখ্য ভূমিকায়। পাহাড়পুুরে যে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে, তার পাশের দুটো গ্রাম মিঠাপুকুর এবং ইসলামপুরের কয়েকজন কারুশিল্পীকে নিয়ে একটা প্রজেক্ট করি। সেই কারুশিল্পীরা শুধু দইয়ের হাঁড়ি, মাটির ঘট আর রান্নার ব্যবহৃত কিছু জিনিস ছাড়া কিছু বানাতে পারে না। ইউনেস্কোর আইডিয়া ছিল পাহাড়পুরে প্রতœতাত্ত্বিক যে নির্দশন রয়েছে পোড়ামাটির ফলকে, আমরাও সে রকম কিছু একটা করি। তাহলে তাদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য কিছুটা আসবে। আমি ওদের বললাম যেহেতু মাটির ফলকগুলোতে সব ফিগারেটিভ কাজ, আমাদের দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এবং তার শতকরা ভাগ যদি হিসাব করি, তাহলে বিপণন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটার সংখ্যাধিক্য না রেখে আমরা আরও নানাবিধ কাজ করতে পারলে, সবার কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াবে। ওরা এই প্রস্তাবে রাজি হলো। এটা ছিল দেড় বছরের প্রজেক্ট। আপনি বিশ্বাস করবেন না, ওরা যা তৈরি করল সেটা অভূতপূর্ব এবং অবিশ্বাস্য। এরপর তাদের ২৬ জনকে আমরা ঢাকায় নিয়ে আসি। শাহবাগে সেসব জিনিসের প্রদর্শনী হয়। সব জিনিস ৯ দিনে বিক্রি হয়ে যায়। তারা টেলিভিশন, পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেয়। তখন সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আর্ট কলেজেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওরা কিন্তু কোনো দিন অর্থভাবে পাহাড়পুরেই যায়নি। এই ব্যাপারে ওদের বিস্ময়ের অন্ত ছিল না।
ওদেরই কিছু টেরাকোটার কাজ আমরা আমেরিকাতে পাঠাই। এরপর আমেরিকার সান্টাফিতে ওরা যায়। সেগুলো তাদের প্রধান গ্যালারিতে স্থান পায়। সুতরাং একজন মানুষের ভেতরে যে কী আছে, তা দেখা যায় না। যখন সেই আগুন দেখা যায়, তখন বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। অনেকবার আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
মোহসীনা লাইজু : কিছুদিন আগে পিঠার নকশা নিয়ে একটা কাজ করেছেন। এই বিষয়ে যদি কিছু বলেন?
চন্দ্রশেখর সাহা : হ্যাঁ, সন্দেশের সঙ্গে আমার একটা পাবলিকেশন আছে। যারা পোশাক শিল্প, বাটিক নিয়ে কাজ করেন প্রথম এটা আমি করেছিলাম কে-ক্রাফটকে নিয়ে। সেটা ছিল নরসিংদী বেল্টে যারা পিঠা নিয়ে কাজ করে তাদের সঙ্গে। এটা সন্দেশের সাজ। করা হয় চালের গুঁড়া, খেজুরের কাটা আর একটা লোহার ছোট পাত দিয়ে। এগুলো দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যে ডিজাইন মনে আসে সেটাই তারা করে। এটাও একটা অভূতপূর্ব বিষয়। আমি যেটা পাবলিকেশনে কাজ করেছি, সেটা হচ্ছে সন্দেশের সাজ। এটা টেরাকোটার মাটির সাজ, দুধ জ¦াল দেওয়ার পর যে ক্ষীর হয়, সেখানে প্রেস করলে ওই নকশা হয়। এটা কিন্তু খাবারই জিনিস, কিন্তু আরও নান্দনিক হয়। এটা অনেক পুরনো প্রথা বাংলাদেশের। সাজগুলো করত অন্য শিল্পীরা। মূলত বিষয়টি পরিবারভিত্তিক। এটার আমসত্ত সাজও আছে। আমার মা একজন প্রশংসিত রন্ধনশিল্পী ছিলেন। তিনি সন্দেশের সাজটা প্রচুর বানাতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণে এটি থাকে। যে কোনো প্রডাক্টের মধ্যে অলংকরণের যে বিষয়টা, যেটা মানুষকে মুগ্ধ করে অন্যান্য দেশের অনেক মোটিফ নিয়ে কাজ করাই যায়। কিন্তু দেশের যে বিষয়গুলো আছে, তার সহজ পদ্ধতি কী হতে পারে? সেই চিন্তা করেই আমি সন্দেশের সাজগুলো করি। এরপর ডিজাইন অ্যানালাইসিস করি। সেটা দিয়ে আর কী করা সম্ভব, সেটাও দেখার চেষ্টা করি।
সাহাদাত পারভেজ : ‘শিল্প পুষ্পাঞ্জলি’ ভারত উপমহাদেেশর প্রথম শিল্পবিষয়ক পত্রিকা। সেখানে চৌষষ্ট্রি কলার কথা আছে। সেখানে ৬৪টিরই বর্ণনা আছে। কিন্তু ৩টি কলা তারা বুঝতে পারেনি। ফলে বিজ্ঞান দর্শন থেকে আলাদা করা হয়। আপনি যে কলার কথা বললেন, সেটা কোন কলার মধ্যে পড়বে?
চন্দ্রশেখর সাহা : সবকিছুই আছে। মানুষ তো আসলে প্রাকৃতিক বিষয়। গাছও একটা প্রাকৃতিক বিষয়। মাছও প্রাকৃতিক। প্রকৃতির সবকিছুই প্রাকৃতিক। ইউনিভার্স, পৃথিবী আর প্রকৃতির যে সম্পর্ক, যে রহস্য তা অনুভব করলেই যে কোনো ক্রিয়েটিভ কাজ লজিক্যালি করা সম্ভব।
মোহসীনা লাইজু : আপনার অনেক কাজ। সেগুলো বলে শেষ হবে না। চারুকলা থেকে বের হওয়ার পর, এই দীর্ঘ সময় কীভাবে কেটেছে? পাঞ্জাবির যে রেভল্যুশন হলো, সেটা তো আপনার হাত দিয়েই?
চন্দ্রশেখর সাহা : আমি চারুকলা থেকে বের হয়েছি ৮১ সালে। আপনি যা বললেন, সেখানে অনেক বিষয় আছে। একবার বিটিভিতে রামেন্দু দা (রামেন্দু মজুমদার) একটি অনুষ্ঠানে আমাকে বলেছিলেন তুমি পাঞ্জাবির এত ডিজাইন করো, একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলে পাঞ্জাবিতে আর তুমি এত সিম্পল পাঞ্জাবি কেন পরো? আমাদের জন্যও এমন কিছু করো। সেই ৮১ সালের দিকের কথা। আসলে যেকোনো দেশের ডিজাইন হতে পারে, লোকজশিল্প সাবজেক্ট হতে পারে। তখন ভাবলাম, একটা চ্যালেঞ্জ নিলে কেমন হয়? তাই-ই হলো। ভাবলাম, এই বছর যদি আড়ংয়ে এত টাকা বিক্রি হয়, তাহলে পরবর্তী বছরে পাঞ্জাবি বিক্রি আরও বাড়াতে হবে। তাই-ই হলো। আড়ংয়ের পুপুলারিটি কিন্তু পাঞ্জাবি দিয়ে। এরপর সবকিছু দিয়ে আস্তে আস্তে বিস্তৃতি লাভ করে।
নীহার সরকার অঙ্কুর : আসলে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, যাদের পরিশ্রমে এত কিছু, সেই অবহেলিত শিল্পীরা, যারা সামনে আসতে চায়, তারা কি প্রকৃত সম্মান, আর্থিক সুবিধা ও মর্যাদা পাচ্ছে?
চন্দ্রশেখর সাহা : অনেকেই এ রকম মনে করে। আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা, আমি জানি না। পটুয়াখালীর বাউফলে একটা কুমারপাড়া আছে। ওদের দিয়ে আড়ংয়ে যখন ডিনার সেট করা হয়, তখন একজন পটার প্রতি মাসে ৫-৭ লাখ টাকার জিনিস সরবরাহ করত। ওদের সমস্ত কাজ সামনে নিয়ে আসার জন্য তো একটা বিপণন প্ল্যাটফর্ম দরকার।
তাপস রায়হান : ওদের সমস্যাটা কোথায়?
চন্দ্রশেখর সাহা : আসলে যারা বুটিক নিয়ে কাজ করে, আপনি একটা শপ দেখাতে পারবেন, আমাদের দেশে যারা আপাদমস্তক খদ্দর নিয়ে কাজ করে, সেখানে তাই-ই রয়েছে। একটা শপ দেখাতে পারবেন, যাদের যত কিছু আছে, সব হ্যান্ডমেইড পেপারের? একটা শপ দেখাতে পারবেন, যার সবকিছু পাট দিয়ে তৈরি? অথচ এসব কিন্তু হওয়ার কথা ছিল। আমাদের ফোকাসটাই অন্যরকম। এখানে এন্টারপ্রাইজরা টাকা লগ্নি করে, সেখান থেকে তার ব্যবসা দেখতে চায়। কিন্তু একমাত্র আড়ং একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যার কাপড়চোপড় ছাড়াও কারুশিল্পের বাহারি পণ্যের বিশাল সমাবেশ রয়েছে। আগে কিন্তু মোমবাতি শুধু থাকত গির্জা, মন্দির আর দরগায়। এ ছাড়া আর কোথাও পাবেন না। কিছু কিছু পাওয়া যেত রঙিন, চিকন শুধু নিউমার্কেটে। যেটা জন্মদিনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আড়ংয়ে আমিই এই মোমবাতিকে নিয়ে এলাম অন্য এক উচ্চতায়। সেখানে আপনি অনেক রকম, অনেক রঙের, অনেক সাইজের মোমবাতি পাবেন। আমি ইংল্যান্ডে দেখেছি, সেখানে মোমবাতি কতো ইম্পর্টেন্ট রোলে প্লে করে। পেট্রোনাইজেশনটা শুধু ভোক্তার দিক থেকে আসলে হয় না। একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার। ওটাই তো বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসবে। আমরা জানি, ৩৭টি নৃগোষ্ঠী বাংলাদেশে রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের কিন্তু টেক্সটাইল এবং গয়না শিল্প আলাদা। ঢাকায় কেউ যদি ভাবত আমি ২০০০ স্কয়ার ফিটের একটা গ্যালারি করব, যেখানে সমস্ত আদিবাসীর প্রডাক্ট সবসময় পাওয়া যায়। এটা তো হতে পারত। নাকি?
নীহার সরকার অঙ্কুর : প্রান্তিক পর্যায়ে যে শিল্পীরা আছেন, তারা কি সব সুযোগ পাচ্ছেন?
চন্দ্রশেখর সাহা : ধরুন, আপনি একজন কারুশিল্পী। কোনো উদ্যোক্তা যদি আপনাকে ব্যবহার করে, আপনি কয় মাস তাকে পণ্য দেবেন? ১/২/৩ মাস? আসলে এখানে এক্সপ্লয়েট করার সুযোগ নেই। আর ডিমান্ডের চেয়ে যদি সাপ্লাই বেশি হয়, তাহলে তো কৃষক তার প্রকৃত দাম পাবেন না! এটা কিন্তু প্রোডাশনের বিষয় না। এটা আবহাওয়া, পেশা, দক্ষতাসহ সব আছে। আপনি দেখবেন, বিরিয়ানির কথা উঠলেই আমরা চট করে হাজির বিরিয়ানির কথা বলি। ফখরুদ্দিন আর স্টার ছাড়া কাচ্চিকে কারা ঢাকায় পরিচিত করেছে? টাইম এবং কনটেকস্ট, এটা কিন্তু খুব ইম্পর্টেন্ট। কারুশিল্প কিন্তু ক্ষয়ে গিয়েও রয়ে গেছে। এটা শুধু আমাদের দেশে না। সারা বিশে^ই একই অবস্থা। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই পাটজাত পণ্যের অনেক মূল্যায়ন হয়। আমদের দেশে তার মূল্যায়ন কী? প্রথমেই তো মনে আসে চালের বস্তার কথা। এটা মানুষের আগ্রহের জায়গাকে বিষণœ করে।
মোহসীনা লাইজু : নকশিকাঁথা নিয়ে একটা প্রদর্শনী হলো কয়েক বছর আগে। এটা নিয়ে কিছু বলুন?
চন্দ্রশেখর সাহা : কাঁথার প্রথম প্রদর্শনী করে আড়ং। সেটা আমারই করা। এরপর জামদানির মোটিফ, প্রকাশনা সেটাও আমার করা। যেটি জিআই পেতে অনেক সাহায্য করেছে।
মোহসীনা লাইজু : আর জামদানি?
চন্দ্রশেখর সাহা : আসলে জামদানিকে সবসময় মূল্যায়নের যে উচ্চতা তা-ও কিন্তু কাকতালীয়ভাবে আমার হাত দিয়েই হয়েছে। জামদানি তাঁতিরা আমাকে খুব ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। আড়ং যখন দ্বিতীয়বার জামদানির প্রদর্শনী করল, এলিট ভোক্তারা কিন্তু আগের দিনও জানতেন না একটি জামদানি শাড়ির দাম ১ লাখ-২ লাখ টাকা হতে পারে! তখন স্বাভাবিক ধারণা ছিল, ২৫-৩০ হাজার। কিন্তু মাত্র তিন দিনে সমস্ত শাড়ি বিক্রি হয়ে যায়। এভাবে ১৩০টা করে তিনবার বিক্রি হয়েছে। আমরা সবসময় একটা কথা শুনি, অনেকে বলেন, কাস্টমার যা চান, আমরা তা-ই বানাই। সেভাবেই তাদের মনমতো জিনিস তৈরি করি।
তাপস রায়হান : এর মানে আমরা আমাদের চাওয়া, রুচি, পছন্দ এবং শিল্পকে গুরুত্ব দিই না?
চন্দ্রশেখর সাহা : এখানেই আসল কথা। বেসিক্যালি ব্র্যান্ড কখনো কাস্টমারের কথা শোনে না। ব্র্যান্ড তার আইডিয়া, ফিলোসফি, ধারণা কাস্টমারকে গ্রহণ করায়। কাস্টমার সবই বোঝেন। যদি আপনি আন্তরিকভাবে তা বোঝাতে চান। তার সেই আগ্রহ রয়েছে।
সাহাদাত পারভেজ : আপনি কবে অনুভব করলেন, আপনি শিল্পী?
চন্দ্রশেখর সাহা : আসলে ডিজাইনের প্রতি আমার বরাবরই আগ্রহ ছিল। সেই প্রথম থেকেই।
সাহাদাত পারভেজ : আপনার লেখালেখি?
চন্দ্রশেখর সাহা : চট্টগ্রাম কলেজে আমি সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলাম। তখন থেকেই লেখালেখি চলছে। প্রচুর বাইরের বই পড়তাম। সাহিত্য আমাকে প্রচুর টানত। সেটা হোক গদ্য বা পদ্য। আসলে লেখালেখির অভ্যাসটা তখন থেকেই হয়েছে। এখনো চলছে।
মোহসীনা লাইজু : পরিবার নিয়ে কিছু বলুন?
চন্দ্রশেখর সাহা : আমার মা কখনো চাননি, আমি চারুকলায় পড়ি। এটা প্রকৃতি নির্ধারিত। হয়ে গেছে। কীভাবে হলো, বলতে পারব না! হাহহাহহা। আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ, যা করতে চাই, যা আমার যোগ্যতা, যা ভালো লাগে ঠিক সেই কাজগুলোই আমার কাছে চলে আসে। এটা কীভাবে যেন এসে যায়। আর আমার ছেলে নেদারল্যান্ডসে পিএইচডি করছে। আর মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায়। ছেলে এখনো বিয়ে করেনি, মেয়ের বিয়ে হয়েছে।
মোহসীনা লাইজু : আর রান্নার বিষয়টা?
চন্দ্রশেখর সাহা : এটা আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া।
শেষে বললেন মানুষ যদি সত্যিকারভাবে প্রকৃতিকে বুঝতে পারে, তার রহস্য নিয়ে উপলব্ধি করে, তাহলে পৃথিবী থেকে হিংসা, লোভ, ক্ষমতার মোহ
থাকবে না। আর দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও পড়বে না। জীবনে সময় খুব কম। সবসময় চাই, সুন্দরের সাধনা করে যেতে।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ
