মানুষ মরণশীল। পৃথিবীতে মানুষের আগমন ঘটে অল্প সময়ের জন্য। এই অল্প সময়ে নিজেকে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করা এবং উত্তম আদর্শে আদর্শবান হয়ে সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করাই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। কুসংস্কার ও মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রেখে একটি আলোকিত সমাজ গড়তে পারাই কোনো ব্যক্তির সফলতা। এর মাধ্যমেই কোনো মানুষ সবার হৃদয়ে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এমন আদর্শের এক প্রকৃত নমুনা হচ্ছেন মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.)। তিনি ছিলেন এ দেশের জন্য রহমতস্বরূপ এবং জাতির সুযোগ্য সন্তান।
এ দেশে ইসলামি শিক্ষার বিস্তার, নববী আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সংস্কারমূলক কাজের মাধ্যমে তিনি চির অমর হয়ে আছেন। একজন মুত্তাকি, পরহেজগার ও দূরদর্শী আলেম হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন এ দেশে ইসলামি রাজনীতির অন্যতম পথনির্দেশক। ভ্রান্ত মতবাদ ও ইসলামবিরোধী সব অপশক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন চির আপসহীন এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। সব অন্ধকারের বিপরীতে ছিলেন আপন কর্ম ও কীর্তিতে উজ্জ্বল এক মহান প্রদীপ।
মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.) ১৯৩৫ সালের ৫ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার অন্তর্গত ন্যায়ামস্তি এলাকায় এক শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাতিল ও অপশক্তিবিরোধী কণ্ঠস্বরের স্পৃহা তিনি বংশপরম্পরায় পেয়েছেন। কেননা তিনি ছিলেন মরহুম আলী মুন্সীর বংশধর, যিনি তৎকালীন একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এবং ব্রিটিশ জালেমদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন। এ চেতনাই পরবর্তী সময়ে তার জীবনকে নিয়ে যায় অনন্য মাত্রায়। দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য তিনি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে যোগ্য করে তোলেন জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও উত্তম আদর্শে। নিজ জন্মভূমি সন্দ্বীপের হরিষপুর মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস, অতঃপর চট্টগ্রামের জিরি মাদ্রাসা, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ এবং লাহোরের জামিয়া আশরাফিয়া থেকে শিক্ষাগ্রহণ শেষ করেন।
এরপর শুরু হয় কর্মজীবন। প্রাথমিকভাবে ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী মাদ্রাসায়, পরবর্তী সময়ে ঢাকার বড় কাটারা মাদ্রাসা এবং ফরিদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায় বহু বছর দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর মিরপুরের তুরাগ পাড়ে তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠান জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ প্রতিষ্ঠানেরই প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে তার কর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ থেকে শুরু করে, স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান, পরবর্তী সময়ে দেশের তৃণমূল মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগসহ বহুবিধ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বে তিনি স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ছিলেন এবং আইয়ুব সরকারের আমলে স্বৈরাচারবিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সম্মিলিত বিরোধী দলের অন্যতম নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তিনি যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। তার প্রচেষ্টায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ রেজুলেশন করে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি প্রকাশ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করেন এবং পাকিস্তানের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কে পাকিস্তানি আর্মির জুলুমের প্রতিবাদে জনসভা ডেকে বক্তব্য রাখেন। এ কারণে পাক সেনারা তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখে।
তিনি একজন আলেম ও নবীর ওয়ারিশ হিসেবে ইসলামি শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। সেজন্য তিনি শাসকদের বিভিন্নভাবে উৎসাহ দিতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ইসলামি সংস্কৃতি, তাহজিব-তমদ্দুন শেখার প্রাণকেন্দ্র যেসব মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেগুলো পুনরায় চালু করার পেছনে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বর্তমানে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সম্মিলিত প্লাটফর্ম ও কেন্দ্রীয় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া প্রতিষ্ঠায় তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। কওমি মাদ্রাসায় নির্ধারিত শিক্ষার পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষারও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন তিনি। পাঠ্যক্রমে মাতৃভাষা বাংলা, ইতিহাস, সমাজ-ভূগোল, পৌরনীতি, গণিত ও ইংরেজির পাঠদান যুক্ত করা ছিল তার যুগান্তকারী সংস্কারমূলক অবদান। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত আরজাবাদ মাদ্রাসায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত জেনারেল শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেন। তারই তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক জমিয়ত ও মাসিক পয়গামে হক।
এ দেশে মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.)-এর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় বাতিলবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে চষে বেড়িয়েছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি ও শাইখুল ইসলাম সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানির বিপ্লবী চিন্তাধারা নিয়ে। বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ ও অরাজকতার বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘খতমে নবুওয়ত আন্দোলন পরিষদ বাংলাদেশ’, ‘মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত’ নামে সংগঠন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে খতমে নবুওয়তের আকিদা সংরক্ষণ আন্দোলনের রূপকার ও বীর সেনানী। যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলাম বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর বাণী উচ্চকিত করতে কাজ করে গেছেন। বিন্দুমাত্র বাতিলের সঙ্গে আপস করেননি। নিজ চেতনা ও আদর্শে ছিলেন চির অটল ও অবিচল। চিন্তা, স্বতন্ত্র চেতনার ভিন্নতা ও কর্মপদ্ধতির পার্থক্য সত্ত্বেও তিনি সব ঘরানার আলেমদের সঙ্গে উষ্ণ ভালোবাসা ও মর্যাদাকর সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। অবশেষে তিনি ১৯৯৬ সালের ১৯ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার মতো একনিষ্ঠ খোদাভীরু, পরহেজগার ও যুগ সচেতন মানুষ এ সময়ে খুব কম দেখা যায়। মহান আল্লাহ তাকে কবরের জগতে সুখে রাখুন, শান্তিতে রাখুন। আমিন।
