উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে মোবাইল অপারেটরদের আয়েও। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেডের আয় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। চলতি প্রান্তিকে ইন্টারনেট শাটডাউনের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা মোবাইল কোম্পানিগুলোর আয়ে প্রভাব ফেলেছে। তবে আয় কমলেও নিট মুনাফা কমেনি কোম্পানিটির। কর পরিশোধের পরিমাণ কম থাকায় শেষ পর্যন্ত নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে কোম্পানিটি।
গতকাল গ্রামীণফোন ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে গ্রামীণফোন লিমিটেড, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। তবে আয় কমলেও কোম্পানিটির পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এ সময়ে বেতন-ভাতায় ব্যয় কমলেও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কম। আগের বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের সুদ ব্যয় কমলেও বিদেশি মুদ্রা বিনিময় হারে লোকসান বেড়েছে। এ সময় কোম্পানিটির সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও, চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে গ্রামীণফোনের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬২ শতাংশ বেশি।
আর্থিক ব্যয় সমন্বয় শেষে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম। গত বছর তৃতীয় প্রান্তিকে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা ছিল ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর পরিশোধের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় অনেকটা কমায় নিট মুনাফা বেড়েছে। এ সময় গ্রামীণফোন কর বাবদ পরিশোধ করেছে ৫৩৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৭৪ কোটি টাকা। কর পরিশোধের পর চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৫৫ কোটি, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৪৭ কোটি টাকা।
গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, এ প্রান্তিক আমাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল, যখন বিশেষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের টিকে থাকার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়েছে। কৌশলগত প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রেখে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা আমাদের আর্থিক ও পরিচালনগত ধারা সুসংহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। এ সংকটকালে আমরা আমাদের গ্রাহকদের মোবাইল অ্যাকাউন্ট রিচার্জ, জরুরি ব্যালান্স গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সেবাসমূহ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি, যাতে তারা এ চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিগুলো মোকাবিলা করতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির টেকসই প্রকিউরমেন্ট কৌশল শুধু নিজস্ব কার্যক্রমে মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের সাপ্লাই চেইনের অংশীদারদের পর্যন্ত বিস্তৃত, যারা সক্রিয়ভাবে টেকসই পদ্ধতির অনুশীলন করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমাদের সরবরাহকারীদের জন্য বরাদ্দকৃত মোট ব্যয়ের ৭২ শতাংশ সেসব কোম্পানিতে ব্যয় হয়েছে, যারা কার্বন নিঃসরণ কমাতে সংকল্পবদ্ধ। আমরা একটি মৌলিক সেবা প্রদান করি এবং ইন্ডাস্ট্রি লিডার হিসেবে আমাদের অবশ্যই সরকারি সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে, যাতে আরও টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং গ্রাহকদের প্রয়োজন মেটায়। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করে যে, আমরা দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল পরিমন্ডলে ন্যায্য এবং কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারি।’
তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির মোট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪৬ লাখে। গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহকের ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ বা ৪ কোটি ৯৩ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন।
গ্রামীণফোন লিমিটেডের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) অটো রিসব্যাক বলেন, ‘এ প্রান্তিক আমাদের ব্যবসার স্থিতিশীলতা কেমন, তা যাচাই করার সুযোগ করে দিয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকের শুরুটা হয়েছিল ইতিবাচক প্রবণতা দিয়ে। কিন্তু বেশ কিছুদিনের অস্থিতিশীলতা ও ইন্টারনেট শাটডাউন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন বন্যার কারণে অর্থনীতি ও আমাদের ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়েছে। এসব ঘটনা সত্ত্বেও আমাদের আয় শুধু ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৯৫০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শক্তিশালী ক্যাশ প্রবাহ ও ব্যালান্স শিটের জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সুযোগ পেয়েছি; পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আকর্ষণীয় লভ্যাংশের নীতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং বহুমুখী ব্যবসা ভবিষ্যতেও স্থিতিশীল ক্যাশ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’
