রণক্ষেত্র মিরপুরে গুলিবিদ্ধ ৪

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪০ এএম

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা। প্রতিদিনের মতো এদিনও ১৪ নম্বরের ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার গার্মেন্টসে প্রবেশের জন্য শ্রমিকরা অপেক্ষায় ছিলেন। তবে শ্রমিকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে আগে থেকেই গার্মেন্টস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল মালিকপক্ষ। অবশ্য শিপমেন্টের তাড়া থাকায় সে সময় মিরপুর থেকে আশুলিয়ায় মালামাল স্থানান্তর করছিল কর্র্তৃপক্ষ। আর সে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের মধ্যে। গার্মেন্টস বন্ধ রেখে মালামাল সরিয়ে ফেলা হচ্ছে এমন তথ্য ছড়িয়ে জড়ো করা হয় আরও শ্রমিক। পরে তারা সড়ক অবরোধ করে শুরু করেন আন্দোলন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্রমিকদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে তাদের সঙ্গে বাধে সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী এলে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। সেনাবাহিনীকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন আন্দোলনকারী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পুলিশ ছোড়ে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড।

পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি ও পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন চার শ্রমিক। এর মধ্যে দুইজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য দুইজনকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক জানান, গুলিবিদ্ধ দুই পোশাক শ্রমিক হলেন আল-আমিন (১৮) ও ঝুমা আক্তার (১৫)। আল-আমিনের দুই কাঁধে ও ঝুমার ডান পায়ের গোড়ালিতে গুলি লেগেছে।

অন্যদিকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া আহত দুইজন হলেন, ওয়েল টাচ গার্মেন্টসের শ্রমিক ফয়সাল ও মিরপুর সিনেটেক্সট গার্মেন্টসের শ্রমিক শাওন।

গার্মেন্টসের বিপরীতে রয়েল ফার্নিচারের কর্মচারী মেজবাহ উদ্দিন বলেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তৈরি পোশাক কারখানার কয়েকশ শ্রমিক বিভিন্ন দাবিতে মিরপুর-১৪ নম্বর কচুক্ষেত সড়কে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এই এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এখানে আন্দোলন করেন। সংঘর্ষ মিরপুর-১৪ নম্বর থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মিরপুর-১৪ নম্বর সড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়কগুলোর যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি ও পুলিশের একটি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও গুলি চালায়। এতে দুই পোশাকশ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয় বলে শুনেছি।

সরেজমিন দেখা গেছে, সেনাবাহিনী ও পুলিশের দুটি পুড়ে যাওয়া গাড়ি পড়ে রয়েছে। অর্ধশতাধিক পুলিশ পোশাক কারখানার সামনে অবস্থান করছে। সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে চার-পাঁচজন সেনাসদস্য দেখা গেছে। থমথমে অবস্থা থাকলেও পুড়ে যাওয়া গাড়ির সামনে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা গেছে। আন্দোলনের মুখে মরিপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত এলাকায় অবস্থিত আটটি গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করায় শ্রমিকদের অলিগলিতে দেখা যায়। দুপুর ১২টার পর এই এলাকার পরিস্থিতি শান্ত হলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আন্দোলন ও সংঘর্ষের বিষয়ে ডিএমপির কাফরুল থানার ওসি কাজী গোলাম মোস্তফা বলেন, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। পোশাকশ্রমিকরা সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তবে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। পুলিশের কোনো সদস্যের এখন পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে দুজন পোশাকশ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। যদি অভিযোগ নাও করে তারপরও কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেনাবাহিনীর ও পুলিশের গাড়িতে কারা আগুন দিয়েছে; সেই বিষয়গুলো তদন্ত করা হবে।

ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার গার্মেন্টসের নিরাপত্তাকর্মী শফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘শ্রমিকদের ভেতরের দ্বন্দ্বে এমন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কবির নামে এক লাইনম্যান শ্রমিকদের চাপ দিয়ে, গালাগালি করে কাজ করান। শ্রমিকরা কবিরের পদত্যাগ চান। পরে কবিরের শ্যালক গত ২৬ অক্টোবর এক নারী পোশাকশ্রমিককে মারধর করেন। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে একজন পুরুষ শ্রমিককেও মারধর করা হয়। কারখানার মালিক কবিরকে পদত্যাগ করতে বললে তার ঘনিষ্ঠরা অন্য শ্রমিকদের কাজে বাধা দেন। কারখানার ভেতরে এমন ঘটনায় তিন দিন কাজ বন্ধ থাকে। এদিকে শিপমেন্টের তাড়ায় কারখানার মালামাল স্থানান্তর করেন মালিক। গতকাল মালামাল স্থানান্তর ও কারখানা বন্ধ রাখায় আশপাশের পোশাকশ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত