উচ্ছ্বাস ভালোবাসা সম্মান সঙ্গে কোটি টাকা

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪২ এএম

সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকে বহন করা বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁতেই ভিআইপি টার্মিনালের প্রধান ফটকে শুরু হয়ে গেল চাঞ্চল্য। কয়েকশ সংবাদকর্মীদের মধ্যে হুল্লোড়, হইচই, ধস্তাধস্তি। সেরা জায়গাটায় বসাতে হবে ক্যামেরা। সবার সামনে গিয়ে শুনতে এবং শ্রোতাদের শোনাতে হবে বীর ফুটবলারদের সাফল্যের অনুভূতি। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে, ভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হয়ে কোচ ডেভিড জেমস বাটলার, অধিনায়ক সাবিনা খাতুন যখন টুর্নামেন্টের দুই সেরাকে সঙ্গে নিয়ে পোডিয়ামের সামনে এলেন, তখন সংবাদকর্মীদের ব্যস্ততা বাড়ল বহুগুণে। এখান থেকেই শুরু সাফজয়ীদের ভালোবাসার বিড়ম্বনা। সেটা চলেছে রাত অবধি, বাফুফে ভবনে পৌঁছানোর অনেক পর পর্যন্ত। বিমান ভ্রমণের পর তিন ঘণ্টা ছাদখোলা বাস ভ্রমণে মেয়েরা তখন বেশ ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্তও। তবে এসবে বিরক্তি প্রকাশ পায়নি একটি বারও। ভালোবাসার এই বিড়ম্বনায় যে বারবার পড়তে চান তারা।

বাটলার ও সাবিনা ছাড়াও টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা এবং সেরা গোলকিপার রূপনা চাকমা ছোট্ট করে তাদের অনুভূতি জানিয়েছেন। এর বেশ কিছুক্ষণ বাদে সদলবলে তারা উঠে পড়েন তাদের বরণে বিশেষভাবে সাজানো দ্বিতল বাসে। ছাদখোলা সেই বাস থেকেই দেখলেন তাদের নিয়ে মানুষের উন্মাদনা। অনেকগুলো সমর্থকগোষ্ঠীর সমর্থকরা সেই বিমানবন্দর থেকেই সঙ্গী হলো মেয়েদের বিশেষ আনন্দযাত্রায়। বারবার পথরোধ করে মেয়েদের ভালোবাসায় ভাসিয়েছেন। পুরো পথ জুড়ে সমর্থকরা ফ্লেয়ারের মধ্যমে লাল-সবুজ রঙা ধোঁয়া উড়িয়েছেন। তাতে যেমন এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে, সেই ধোঁয়ায় ফুটবলারদের চোখেও জ¦ালা ধরিয়েছে বারবার। লম্বা যাত্রাপথে সাবিনারা বারবার শূন্যে উঁচিয়ে দেখিয়েছেন মর্যাদার শিরোপা। সেই কাক্সিক্ষত শিরোপায় চোখ পড়তেই শুরু হয়ে গেছে হর্ষধ্বনি। যার জন্য গেল দুই সপ্তাহ কী অমানুষিক পরিশ্রমটাই না করেছেন ফুটবলাররা। কত বাধা, কত ঝড়ের সঙ্গে লড়তে হয়েছে মাঠ ও মাঠের বাইরে সবখানে। তবে সবকিছু পেছনে ফেলে ঠিকই তারা মুকুট হাতছাড়া হতে দেননি।

এই অভিযানে দলের ডাগআউটের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। খেলোয়াড়দের সঙ্গে যার বিরোধটা প্রকাশিত হয় টুর্নামেন্ট চলাকালে। বেশ কিছু সিনিয়রে অনাস্থা আনাতেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। এ নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে একে অন্যকে দোষারোপের খেলায় মেতেছিলেন তারা। তবে সব বিতর্ককে একপাশে রেখে মেয়েরা খেলেছেন চোখ ধাঁধানো ফুটবল। হিমালয়ের কোলে ফুটবল ফুল ফুটিয়ে আরেকবার সেরা হয়েছেন সাবিনা-ঋতুরা। বুধবার সন্ধ্যায় পুরস্কার বিরতণী অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি বাটলারকে। শিরোপা নিয়ে শিষ্যদের উদযাপনেও ছিলেন না কোচ। তবে দেশে ফেরার পর আর মুখ ফিরিয়ে রাখেননি। ঠিকই কথা বলেছেন। আবার দলের সঙ্গী হয়ে ছাদখোলা বাসেও চড়ে বসেছেন। বাংলাদেশকে দ্বিতীয়বার সাফ জেতানো নেপথ্যের কারিগর বাটলার অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে শিরোপা জেতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন তরিকায় এটা আমরা জিতেছি। এটা আমরা অর্জন করেছি সত্যিকারেই ভালো ফুটবল খেলে। একেবারে প্রথম দিন থেকেই প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্বগুলো ঠিকভাবে পালন করে গেছে। আমি আগে থেকেই বলেছি, শুধু ১১ জনে আপনি এটা জিততে পারবেন না। জিততে হলে পুরো একটা স্কোয়াডকেই লাগবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা আমার জন্য ভীষণ গর্বের।’ এরপরই মেয়েদের দায়িত্ব ছাড়ার কথা বললেন এই কোচ, ‘আমার সত্যি বললে কোনো প্রত্যাশা ছিল না। আমি এটাকে দৈনিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। হয়তো মেয়েদের সঙ্গে যাত্রাটা সামনেই শেষ হতে চলেছে। বাফুফের সভাপতি (সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন) ও কিরণ ম্যাডামের (সাবেক মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার) অনুরোধে আমি মেয়েদের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার সময় কথা দিয়েছিলাম, আমি দলকে সাফ জেতাব। সেই প্রতিশ্রুতি আমি রেখেছি।’

গত আসরের সেরা গোলদাতা ও খেলোয়াড় হয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। এবার ব্যক্তিগত সেই অর্জনগুলো হাতছাড়া হলেও কষ্ট নেই তার। বরং পজিশন বদলে দলের সাফল্যে অবদান রাখতে পেরেই খুশি তিনি। দেশে ফিরে সাবিনার সাফজয়ের অনুভূতি ছিল এমন, ‘প্রথমেই ধন্যবাদ দিতে চাই দেশের মানুষদের, যারা এই জয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন। সবাইকে খুশি করতে পেরে, দলের সব সদস্য ও বাফুফের সবাই অনেক আনন্দিত এবং সর্বপ্রথম ধন্যবাদ দিতে চাই সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন স্যার ও ওমেন্স কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ এবং বর্তমান সভাপতি তাবিথ আওয়াল স্যার ও নতুন কমিটিকে। সবার দোয়া ও সমর্থনে আজ এই সফলতা এসেছে। দ্বিতীয়বারের মতো এই আনন্দ প্রথমবারের শিরোপা জয়ের মতোই লাগছে। এত মানুষের সমাগমই প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে কতটা ভালোবাসে। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। সব কোচিং স্টাফ, যারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানাতে চায়।’

পরপর দ্বিতীয়বারের মতো সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতি পাওয়া রূপনা চাকমা সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। আর ফাইনালে জয়সূচক গোল করে টুর্নামেন্ট সেরার খেতাবজয়ী উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমা শিরোপা দেশবাসীকে উৎসর্গ করে চেয়েছেন আরও বড় মঞ্চে ভালো খেলার আশীর্বাদ। এদিকে বাফুফে ভবনে পৌঁছানোর পর দলকে অভ্যর্থনা জানানোর পাশাপাশি ১ কোটি টাকার অর্থ পুরস্কার তুলে দেন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ ছাড়া সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আগামী শনিবার নিজ বাসভবনে বিজয়ী মেয়েদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে জানিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত