কোরআন-হাদিসে বিনয় ও নম্রতা

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৩৬ এএম

বিনয় ও নম্রতা মানবজীবনের এক মহৎ গুণ। বিনয় শব্দের অর্থ কোমলতা, মিনতি। আর নম্রতা শব্দের অর্থ বিনীত, ঔদ্ধত্যহীন, নিরহংকার, অবনত ইত্যাদি। কথাবার্তা, কাজ-কর্ম, চাল-চলন ও আচার-আচরণে অন্যের তুলনায় নিজেকে ছোট ও ক্ষুদ্র মনে করা এবং অন্যদের বড় ও সম্মানিত মনে করাই বিনয়। বস্তুত নিজেকে সৃষ্টি জগতের মধ্যে উঁচু মর্যাদার অধিকারী মনে না করা এবং মানুষ ও মহান আল্লাহর প্রত্যেক সৃষ্টি জীবকে স্ব স্ব সম্মান প্রদান করার নামই বিনয় ও নম্রতা। এটি আদর্শ মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। যার বিনয় ও নম্রতা রয়েছে সে দুনিয়া ও আখেরাতে অফুরন্ত কল্যাণ লাভে ধন্য হবে।

ইয়াহইয়া ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘বিনয় তিন গুণের সমষ্টি। এক. উত্তম মজলিসে নিজেকে ছোট মনে করা। দুই. আগে অন্যকে সালাম দেওয়া। তিন. আত্মপ্রশংসা, খ্যাতি এবং নিজের কৃত কল্যাণকর কাজ প্রকাশ পাওয়াকে অপছন্দ করা। (আত তাওয়াজু ওয়াল খুমুল ১৫৫)

বিনয় ও নম্রতা একজন মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মুমিন ব্যক্তির কথাবার্তা, আচার-আচরণ, লেনদেন, ওঠা-বসায় এমনকি হাঁটা-চলায় বিনয় প্রকাশ পায়। এসব গুণের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বিনয়ী ও নম্র স্বভাবের মানুষের প্রশংসায় বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহর বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’ (সুরা ফুরকান ৬৩) রাসুল (সা.) মুমিনের প্রশংসা করে বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি নম্র ও ভদ্র হয়। আর পাপী মানুষ ধূর্ত ও চরিত্রহীন হয়।’ (তিরমিজি ১৯৬৪) আল্লাহতায়ালা কথাবার্তা, কাজ-কর্ম, চাল-চলন ও আচার-আচরণে ঔদ্ধত্য ও অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ধীরস্থির ও নম্ররতা অবলম্বন পূর্বক সংযত হয়ে চলাফেরা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে পদচারণা করো না। কারণ আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান ১৮) অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই তুমি পদভারে ভূপৃষ্ঠকে কখনোই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বতসম হতে পারবে না।’ (সুরা বনি

ইসরাইল ৩৭)

ব্যক্তি জীবনে যে যত বিনয়ী ও নম্র, সে তত সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। যে বিনয়কে নিজের ভূষণ বানিয়ে নেবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তার সম্মান বাড়বে। মানুষের ভালোবাসায় সে সিক্ত হবে। আল্লাহর নৈকট্য লাভেও ধন্য হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী প্রত্যেক বিনয়ী ও নম্র লোকের জন্য জাহান্নাম হারাম।’ (তিরমিজি) পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং বিনয়ী হয়েছে তাদের রবের প্রতি, তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে অনন্তকাল স্থায়ী হবে।’ (সুরা হুদ ২৩) জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করা সদকা। অর্থাৎ সদকা করার মাধ্যমে যে পরিমাণ সওয়াব হবে, মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করলেও সেই একই পরিমাণ সওয়াব হবে।’ (শুআবুল ইমান) ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে কোমলতা ও নম্রতা যখন সবাইকে আবিষ্ট করে, কল্যাণও তখন সর্বব্যাপী হয়ে দুই কূল উপচে বয়ে চলে। নিম্নোক্ত হাদিসে আমরা এর প্রমাণ পাই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো গৃহের অধিবাসীদের কল্যাণ চান, তখন তাদের মাঝে কোমলতা ও নম্রতা প্রবেশ করান।’ (মুসনাদে আহমদ ৩০৩) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে বলেছেন, ‘কোমলতা নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও, কঠোরতা ও নিলর্জ্জতা হতে নিজেকে বাঁচাও। কারণ যাতে নম্রতা ও কোমলতা থাকে, তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। আর যাতে কোমলতা থাকে না, তা অসুন্দর হয়ে পড়ে।’ (মুসলিম) নম্রতার মাধ্যমে চকৎকার ফলাফল এবং সুন্দর পরিণতি লাভ হয়। নম্র আচরণে আল্লাহ বরকত দান করেন এবং উপকৃত করে থাকেন। পক্ষান্তরে কঠোরতা ও রূঢ় আচরণের কারণে কাক্সিক্ষত বিষয় নষ্ট হয়ে যায় এবং কঠিন হয়ে পড়ে। জাবের (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যাকে কোমলতা বা নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম)

এ পৃথিবীতে যারা আজীবন স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় আসন লাভ করে আছেন, তাদের প্রত্যেকেই বিনয়ী ও নম্র ছিলেন। সর্বকালের সেরা মানব রাসুল (সা.) ছিলেন বিনয় ও নম্রতার মূর্ত প্রতীক এবং

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিনয়ী ও নম্র মানুষ। বিনয় ও নম্রতা দ্বারা তিনি মানুষকে আপন করে নিতেন। তিনি ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ এমনকি শিশু, ভিক্ষুক নির্বিশেষে সবার সঙ্গে বিনীত আচরণ করতেন। নবুয়তের সুবিশাল দায়িত্ব কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার বিশালত্ব তার এ ধরনের বিনম্র আচরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সম্মানের শীর্ষ চূড়ায় একমাত্র আরোহী হয়েও তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিনয়ী।

আল্লাহর রাসুলের বিনয় ও নম্রতার কথা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ হয়েছে এভাবে, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫৯) রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি আদম সন্তানের সর্দার, তবে এতে গর্বের কিছু নেই। কেয়ামতের দিন আমার কবরের মাটিই প্রথম সরানো হবে, এটাও গর্বের কিছু নয়। সেদিন আমিই প্রথম সুপারিশ করব, আমার সুপারিশই প্রথম গৃহীত হবে। এতেও অহংকার করার কিছু নাই। সেদিন ‘হামদ’-এর পতাকা আমার হাতে

থাকবে, তাতেও কোনো বড়াই নেই।’ (ইবনে মাজাহ)

রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্যে সাহাবিরাও অর্জন করেছিলেন বিনয়ের গুণ। আবু মুলাইকা (রা.) বলেন, ‘আবু বকর (রা.) উটের পিঠে ছিলেন। তার হাত থেকে উটের লাগাম পড়ে গেল। লাগাম উঠানোর জন্য তিনি উটকে বসালেন এবং লাগাম তুলে নিলেন। আবু মুলাইকা বলেন, আমি বললাম, আমাকে আদেশ করলে আমিই তা তুলে দিতাম। আবু বকর (রা.) বললেন, আমার হাবিব রাসুল (সা.) আমাকে কারও কাছে কোনো কিছু চাইতে নিষেধ করেছেন।’ (সিফাতুস সফওয়া ১/২৩৫) উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রা.) বলেন, ‘আমি দেখলাম, ওমর (রা.) নিজ কাঁধে পানির মশক বহন করছেন। আমি বললাম, আপনি নিজে মশক বহন করছেন কেন? উত্তরে বললেন, গত দিন বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধি দল এবং শ্রোতারা আমার কাছে এসেছিল। এতে আমার অন্তরে অহংকার অনুভব হচ্ছে। তাই আমি তা দূর করছি।’ (মাদারিজুস সালিকিন ২/৩৩)

আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হতে চাইলেও বিনয় আবশ্যক। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহতায়ালা নিজে কোমল, তিনি কোমলতাকে ভালোবাসেন। আর তিনি কোমলতার জন্য যা দান করেন, কঠোরতা বা অন্য কোনো কিছুর জন্য তা দান করেন না।’ (সহিহ মুসলিম) প্রকৃতপক্ষে দয়া, কোমলতা, সহৃদয়তা ও সহজ-স্বাভাবিক আচরণের দ্বারা মানুষের হৃদয়ের দুয়ার খোলা যায়, মানুষকে হকের দিকে আহ্বান করা যায়। অযাচিত কঠিন ও রূঢ় আচরণের মাধ্যমে কারও হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব হয় না। কখনো হবেও না। এজন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সহজ ও নরম আচরণ করো। কঠিন ও রূঢ় আচরণ করো না এবং সুসংবাদ দাও, ঘৃণা ও পলায়নে সহায়তা করো না।’ (সহিহ বুখারি)

উল্লিখিত হাদিস হতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মুসলিম নারী-পুরুষ সকলেরই কোমলতা তথা বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত