বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘যত দেরি করবেন, তত হাসিনারা আবার ফিরে আসবেন। তাই এখনো বলছি, আবারও বলছি, অতিদ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করুন। জঞ্জাল যা আছে, তা সাফ করে ফেলুন। দায়িত্বটা আপনাদের ওপর দেওয়া হয়েছে। আমরা সব সময় সহযোগিতা করেছি। আপনারাও সহযোগিতা করেন। পদে পদে আমরা উসখুস করছি, ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছি, এ ধরনের কথা বলে মানুষের মনকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।’
গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত সভায় মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা একটা ভয়াবহ দানবের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। বুকের ওপর থেকে পাথর গেছে। কিন্তু পাথর গেলেও এখনো কিন্তু স্বস্তি নেই। কোথায় যেন আটকে আছি। আমাদের জনগণের সরকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আপনার (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব জুড়ে। এই সুনাম রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। যে দায়িত্ব আপনার ওপর পড়েছে, সেই দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবেন। অর্থাৎ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত পার্লামেন্ট এবং সরকারের কাছে ক্ষমতা দিতে হবে।’
নাম উল্লেখ না করে একজন উপদেষ্টার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, “তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উসখুস করছেন।’ এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আশা করি না, এই মাপের মানুষ এ ধরনের কথা বলবেন। আমরা রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উসখুস করি না। আমরা বাংলাদেশকে হাসিনামুক্ত করার জন্য কাজ করেছি। জীবন দিয়েছি, প্রাণ দিয়েছি, এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা দ্রুত করছি।”
কারও নাম উল্লেখ না করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আবারও চক্রান্ত করে বিএনপিকে বাদ দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করতে যাবেন না। এটা বাংলাদেশের মানুষ কখনোই মেনে নেবে না। একবার বিরাজনীতিকরণের মাইনাস টু করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আবারও ওই রাস্তায় যাওয়ার কথা কেউ চিন্তা করবেন না।’
দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু করবেন না, যাতে দলের বিরুদ্ধে কেউ আঙুল তুলে কথা বলতে পারে। এটা করবেন না, করতে দেবেন না। সব সময় মনে রাখবেন।’
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এখন তরুণ প্রজন্মের যুগ। যখন আব্বাস ও খোকা ভাই ছিলেন তখন ঢাকা শহর কাঁপত। তোমাদেরও কাঁপাতে হবে। শেখ হাসিনা খোকা ভাইয়ের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কখন পরাজিত হন? যখন মানুষটিকে মানুষ নিজের কাছের মানুষ হিসেবে বেছে নেয়। আমি তাকে কখনো উত্তেজিত হতে দেখিনি, অত্যন্ত ভাবনা-চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। তার মৃত্যু আমাদের কাছে পাহাড়ের মতো ভারী হয়েছিল।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এই নির্বাচন খুব তাড়াতাড়ি ওনারা দেবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত এ দেশে আওয়ামী লীগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত আর নির্বাচন দেবেন না।’ এই ভাবনার কারণ হিসেবে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ না করে আব্বাস বলেন, ‘সচিবরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা বসে আছেন, খেয়াল করে দেখবেন ওরা কারা।’
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই ঘোলাটে মনে হচ্ছে জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না, হাসিনা তো চলে গেল। কিন্তু তার দোসররা তো রয়ে গেল এখনো। সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থায় হাসিনার লোকজন পাকাপোক্তভাবে বসে গেছেন। একজন বিশেষ ব্যক্তি আছেন, যিনি এই দেশটাকে ধ্বংসের শেষ দিকে নিয়ে যাবেন, যদি ড. ইউনূস সাহেব ওনার প্রতি কোনো ব্যবস্থা না নেন। তিনি খুব কাছাকাছি থাকেন শ্রদ্ধেয় ইউনূস সাহেবের। সেই সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ধ্বংসের জন্য যা কিছু করার দরকার, তা করে যাচ্ছেন অবলীলায়।’ তবে ওই ব্যক্তির নাম বলেননি মির্জা আব্বাস।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলমের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ও বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন প্রমুখ।
ফ্যাসিস্টরা প্রতিটি নির্বাচনের ফল কেড়ে নিয়েছিল : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ শুধু দেশটাকেই ধ্বংস করেনি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে প্রতিটি নির্বাচনকে তারা তাদের মতো করে সাজিয়ে ছিল। চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনপ্রিয় নেতা সাবেক মহানগর আহ্বায়ক (শাহাদাত হোসেন) প্রতিযোগিতা করে জিতেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্টরা বল প্রয়োগভাবে জনগণের ফল কেড়ে নিয়েছিল। আমি ধন্যবাদ জানাই নির্বাচন কমিশন ট্রাইব্যুনালকে। তারা ডা. শাহাদাতকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তারা আদালতের রায়কে মেনে নিয়ে তাকে (শাহাদাত হোসেন) চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করিয়েছে।’ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই ফ্যাসিস্টদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের সমাধিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নতুন মেয়র শাহাদাত হোসেনকে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের কাছে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত ধানের শীষ প্রতীকে পান ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফল বাতিল চেয়ে ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক শাহাদাত।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই মামলার রায়ে গত ১ অক্টোবর শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীন। এরই ধারাবাহিকতায় মেয়র হিসেবে গতকাল রবিবার সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের কাছে শপথবাক্য পাঠ করেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলর না থাকায় করপোরেশন পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘শাহাদাত হোসেনকে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণার পর প্রমাণিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ গত তিনটি নির্বাচন দখল করে নিয়েছে। এখন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে নতুনভাবে সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আশাবাদী।’
এ সময় শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রামকে বাঁচালেই বাংলাদেশ বাঁচবে। আমাদের যেই ইশতেহার চট্টগ্রামকে গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি ও হেলদি সিটি করার, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাব। আজকের এই বিজয়ের মাধ্যমেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যা আজকে জর্জরিত। চট্টগ্রামে ইনফ্রাস্ট্রাকচার আপনারা ডেভেলপ করুন। চট্টগ্রামকে আপনারা বাঁচিয়ে রাখুন।’
এ সময়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, মাহবুবে রহমান শামীমসহ চট্টগ্রামের মহানগরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
