চলতি বছরের ৯ মাসে বেসরকারি সিটি ব্যাংকের নিট মুনাফা ১৯ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও মুনাফা বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ। সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে সিটি ব্যাংকের মুনাফা ২৬৮ শতাংশ বেড়েছে। এতে করে চলতি ৯ মাসে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। গতকাল প্রকাশিত ব্যাংকটির অনিরীক্ষিত প্রান্তিক প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ হার ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদ হার ১১ দশমিক ৬৪ থেকে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। আর বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ হার ১১ দশমিক ৯৬ থেকে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত এই বিনিয়োগে সুদ হার আকর্ষণীয় হওয়ায় সব ব্যাংকই এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে চলেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় চলতি বছর ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সিটি ব্যাংকের বিনিয়োগ ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সিটি ব্যাংকের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ ৩ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। অবশিষ্ট বিনিয়োগ বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে। ২০২৩ সালের প্রথম ৯ মাসে এ খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ছিল ৬ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা।
চলতি বছরের ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) সরকারিসহ বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে এককভাবে সিটি ব্যাংকের আয় হয়েছে ৯৮৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের একই সময়ে এ খাত থেকে সিটি ব্যাংকের আয় ছিল ৩১২ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ মাসে ট্রেজারি বিল, বন্ড রিভার্স রেপো থেকে সিটি ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর সরকারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে মুনাফা হয়েছে ১২১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর বাইরে সুকুক ও বেসরকারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে কিছু আয় হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমানত ও ঋণ বিতরণ করে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত নিট সুদ আয় হয়েছে ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বিনিয়োগ, কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ এবং অন্যান্য পরিচালন থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯০০ কোটি টাকা। এ সময় মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকা।
চলতি ৯ মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। এই ব্যয় সমন্বয় শেষে সিটি ব্যাংকের পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৩২ কোটি টাকা। তবে পরিচালন আয়ে ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মিললেও ব্যাংকটি এ সময়ে ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সঞ্চিতি (প্রভিশন) দেখিয়েছে। এতে করে পরিচালন আয়ে যতটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে নিট মুনাফায় ততটা হয়নি।
চলতি বছরের ৯ মাসে ব্যাংকটি ঋণ ও অগ্রীমের বিপরীতে ৫৯৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিনিয়োগ মূল্য কমে যাওয়ায় ৬২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সঞ্চিতি করেছে। সবমিলিয়ে চলতি ৯ মাসে সিটি ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ৬৪১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২২৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছরে ব্যাংকটির কর পরিশোধের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ৯ মাসে ব্যাংকটির কর পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৫৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭২ শতাংশ বেশি। কর পরিশোধের পর চলতি ৯ মাসে সিটি ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৭৯ কোটি টাকা।
গতকাল প্রান্তিক ফল প্রকাশের সময় চলতি বছর শেষে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন। ৯ মাসে পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি জানান, ব্যাংকের আমানত এই ৯ মাসে ১০ হাজার ১০০ কোটি টাকা বাড়লেও আমানতের ব্যয় সাড়ে ৪ শতাংশে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি বিল-বন্ডের বিনিয়োগ থেকে ভালো অঙ্কের আয়ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণ বলে জানিয়েছেন তিনি।
কর পরবর্তী সময় মুনাফা ততটা না বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ অতিরিক্ত ধরে রেখেছে, যা বছর শেষে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
