যানজটে স্থবির ঢাকা সতর্কতার প্রয়োজন ছিল না বলছে পুলিশ

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:১৪ এএম

সকাল থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ছিল তীব্র যানজট। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যা অসহনীয় আকার ধারণ করে। কোথাও কোথাও নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে গণপরিবহন। এমন পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রমুখী মানুষরা বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। বিপাকে পড়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী এবং সঙ্গে থাকা তাদের অভিভাবকরাও। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসা, তাবলিগ ও দ্বীন রক্ষার লক্ষ্যে ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশের ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে ঢাকায় ঢোকা বাড়তি মানুষ ও রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের কারণে যানজটে এমন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।

সকাল ৯টায় বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে গুলিস্তানগামী বলাকা পরিবহনের বাসে ওঠেন সাইদুল ইসলাম। কিন্তু বাসটি তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো এলাকায় যেতেই যানজটে আটকা পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টায় বাসটি মগবাজার রেল ক্রসিংয়ে পৌঁছায়। পরে বিরক্ত হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটে পল্টনের উদ্দেশে রওনা হন সাইদুল। তিনি বলেন, ‘যানজটের কারণে বাসের অধিকাংশ যাত্রী নেমে গেছে। বিরক্ত হয়ে আমিও নেমে যাই।’

সাধারণত সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর সড়কগুলোতে যানজটে আটকা পড়ার ঘটনা ব্যতিক্রম। তবে এ সময়ে কারওয়ান বাজার সিগন্যালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যানজটে ১০ মিনিটের মতো আটকে ছিলেন ঝর্ণা আখতার। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই নারীকর্মী বলেন, ‘অন্যদিন খুব সকালে ঢাকার রাস্তায় এত এত যানবাহন দেখিনি কোনোদিনই। অনেক গাড়ির চাপে সকাল ৭টায় রাস্তায় জ্যামে আটকে ছিলাম।’

ধানম-ি-১৫ নম্বর থেকে সকাল ১০টায় প্রেস ক্লাবের উদ্দেশে রওনা হন সুমন মাতুব্বর। তীব্র যানজট ঠেলে দুপুর ১২টার সময় গন্তব্যে পৌঁছান। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় এত জ্যাম! ২০ মিনিটের রাস্তায় পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা লেগেছে। ঢাকার বাইরে থেকে সমাবেশে আসা লোকজনের বাস রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে যানজট আরও বেশি হয়েছে। কাঁটাবন মোড় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে এসব বাস দাঁড় করানো দেখছি। পুরো পথে শুধু শাহবাগ মোড়ে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দেখেছি।’ একই চিত্র দেখা গেছে কাকরাইল, বাংলা মোটর, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায়ও। গতকাল এসব এলাকায় চলাচল করা নগরবাসীও অসহনীয় যানজটে দুর্ভোগের অভিযোগ করেন।

মহাসমাবেশের মতো এমন কর্মসূচির দিনে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের পর্যাপ্ত সদস্য না থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা এমন কোথায় দেখেছেন জানি না। প্রত্যেক জায়গায় আমাদের পর্যাপ্ত ট্রাফিক সদস্য ছিল।’

অনেক আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ মহাসমাবেশের অনুমতি নেওয়া হয় ডিএমপি থেকে। সাধারণত এ ধরনের বড় সমাবেশ থাকলে অতীতে সেদিন যানজট এড়াতে ডিএমপির পক্ষ থেকে সড়কে চলাচলের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হতো। গতকালের সমাবেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া থাকলে নগরবাসীর ভোগান্তি কম হতো বলে মনে করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘এত বড় সমাবেশ অথচ আগে থেকে কোনো ট্রাফিক নির্দেশনা দেয়নি পুলিশ। এটা দিলে ভোগান্তি অনেক কম হতে পারত।’

এ বিষয়েও জানতে চাওয়া হয় উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নির্দেশনা জাতীয় দিবসগুলোতে দেওয়া হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখের মতো দিনে এসব করা হয়।’ যদিও বিগত সময়গুলোতে বড় রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর এ ধরনের সমাবেশ ঘিরে সাধারণ নাগরিকদের সড়কে চলাচলের আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হতো। রোডম্যাপে সমাবেশস্থল-সংলগ্ন সড়ক ও নির্ধারিত কিছু সড়ক এড়িয়ে চলাচলের পরামর্শ থাকত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। বড় সমাবেশ হলে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে থেকে আসা লোকজনের ব্যবহার করা গাড়ি রাখার জায়গা নির্ধারিত থাকত।

এদিকে সড়কে যানজটের কারণে মেট্রোরেলে মানুষের চাপ ছিল বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এরই মধ্যে আবার মহাসমাবেশে যাওয়া হাজারো মাদ্রাসাছাত্র ও শিক্ষককে মেট্রোরেলে চড়ে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন থেকে মতিঝিল ও উত্তরাগামী যাত্রীর চাপ বেশি দেখা গেছে। এতে মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াতকারীরা ভোগান্তিতে পড়েন। মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন থেকে টিএসসি স্টেশনে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসম্মেলনের কারণে সড়কপথে তীব্র যানজট তৈরি হয়। তাই অনেকেই বাস ছেড়ে মেট্রোরেলে টিকিট করেছেন। তবে সম্মেলনে আসাদের অনেকে শখে মেট্রোরেল ভ্রমণ করছেন। এতে প্রতিটি স্টেশনে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।’

দুপুর ২টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ শেষ হয়। এরপর সমাবেশ থেকে বের হয়ে আসেন মুসল্লিরা। তারা একযোগে বের হওয়ার কারণে আবার ঢাকার রাস্তা স্থবির হয়ে পড়ে, যা স্বাভাবিক হতে সময় লাগে বেলা ৩টা পর্যন্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত