দেশবরেণ্য উলামায়ে কেরামের মধ্যে শায়েখ জাহিদ হোসাইন অন্যতম। সর্বসাধারণের কাছে তিনি মাওলানা জাহিদ নামে পরিচিত। পঠন-পাঠনই তার ধ্যান-জ্ঞান। তিনি একজন প্রতিভাবান আলেম ও সমাজ সেবক। তিনি বহুমুখী যোগ্যতা ও প্রতিভার অধিকারী। নানা যোগ্যতা ও প্রতিভায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। পরিণত হয়েছেন ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে। সাদাসিধে, শান্ত ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ তিনি। মন-মানসিকতায় তিনি অত্যন্ত উদার। কথাবার্তা, চলাফেরা ও আচার-আচরণে তার মাঝে কখনো সংকীর্ণতা দেখা যায় না। উদারতার কারণে তিনি সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত। ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে সব সময় উম্মতের স্বার্থই তার কাছে মুখ্য বিষয়। অধ্যাপনা করেছেন দেশের খ্যাতনামা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সব সময় ছাত্রদের স্বার্থের কথা ভেবেছেন। ছাত্রদের সঙ্গে তার আচরণ পিতৃসূলভ।
অধ্যক্ষ পদে ছিলেন প্রায় দুই যুগ। অধীনস্তদের সঙ্গে তার আচরণ ছিল সহোদর ভাইয়ের মতন। দীর্ঘ ৪০ বছর একাধারে হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও আরবি সাহিত্যের পাঠদান করে বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। তবে থেমে নেই তার গবেষণা কর্ম। বয়সের সঙ্গে শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিলেও নিত্যদিনের সঙ্গী অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়েই চলছে তার অধ্যয়ন। তিনি এখন
কোথাও নিয়মমাফিক পাঠদান করেন না। তবে শিক্ষা-দীক্ষার মধ্যেই কাটছে তার ব্যস্ততা। কর্মজীবনের শুরু থেকে আজও পর্যন্ত নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন ইলমে নববির প্রচার ও প্রসারের কাজে। তার ইচ্ছা বাকি জীবনও নিজেকে এই মহৎ কাজে ব্যস্ত রাখবেন। সমাজে রয়েছে তার অসামান্য অবদান। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সব সময় তিনি এগিয়ে থাকেন। তিনি জনদরদি একজন আলেম। মানুষের প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করেন।
তিনি লক্ষ্মীপুরের বশিকপুর ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা শামছুল হক (রহ.) ছিলেন একজন বিদগ্ধ আলেম। দাদা মরহুম হাজি সেরাজুল হক ও পর দাদা মরহুম আবদুল্লাহ মুন্সি। যিনি ছিলেন তৎকালীন মৌলভী। পারিবারিকভাবেই তারা দ্বীনদার ও শিক্ষানুরাগী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ছোটবেলা থেকে মা-বাবার নিবিড় তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন এবং নিজ মায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শেখার মধ্য দিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন।
১৯৬৮ সালে নিজ গ্রামের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিরাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। ১৯৭২ সালে বশিকপুর কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ইলমে নববি অর্জনের সফর শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৬ সালে দাখিল এবং ১৯৭৮ সালে আলিম উভয় পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৮ সালে টুমচর কামিল মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাজিল পাস করেন। ১৯৮২ সালে নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে হাদিসশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সহিহ বুখারির শেষ হাদিস সাইয়্যেদ আসআদ মাদানির কাছে পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮০ সালে মুমিন বাড়িয়ার মাওলানা কারি আবুল বাশার (রহ.)-এর কাছে ইলমুল কেরাতের শিক্ষালাভ করেন। ১৯৮১ সালে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মদিনার তত্ত্বাবধানে আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করেন। হাদিস ও ফিকহ তার মূল আগ্রহের বিষয়। আরবি ভাষার প্রতিও রয়েছে বিশেষ অনুরাগ। এছাড়া রাসুল (সা.)-এর সিরাত অধ্যয়নে তার আগ্রহ ঈর্ষণীয়।
পড়ালেখা শেষ করে ১৯৮২ সালে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। পটুয়াখালী পাংগাশিয়া কামিল মাদ্রাসা তার প্রথম কর্মস্থল ছিল। আরবি প্রভাষক হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ৭ মাস পাঠদান করেন সেখানে। তখন সহিহ বুখারি ও মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবাদি পাঠদান করান। একই সঙ্গে উসুলে হাদিসের বিভিন্ন কিতাবেরও পাঠদান করতেন। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর বশিকপুর কামিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে অবসরে আছেন। তবে তার ধর্মীয় ও দাওয়াতি কার্যক্রম থেমে নেই। নিজ গ্রামের জামে মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন এবং মানুষের মধ্যে দ্বীনের আলো ছড়াচ্ছেন। আমরা এই মহান ব্যক্তির সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
