আনুপাতিক ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি আব্দুর রউফ। গতকাল বুধবার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। অন্যদিকে নির্বাচনের সময়ে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার পরামর্শ দেন ইসি সচিব শফিউল আজীম। আর পুলিশ ও মাঠ প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান সংস্কার কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। নির্বাচনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারে জন্য সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করছে এ-সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন। যারই ধারাবাহিকতায় গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাবেক সিইসি বিচারপতি আব্দুর রউফের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কমিশনের সদস্যরা। এ সময় নির্বাচনী ব্যয় কমানো ও মনোনয়নবাণিজ্য বন্ধে আনুপাতিক হারে ভোট করার পরামর্শ দেন তিনি।
সংস্কার কমিশনের সঙ্গে মতবিনিময় হয় নির্বাচন কমিশন সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের। এতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ বলেন, ‘নির্বাচনকে সরলীকরণ করতে হবে। মনোনয়নবাণিজ্য যদি বন্ধ করা না যায় সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। কেননা, মনোনয়নপত্র বাণিজ্যই নির্বাচনকে ট্রেডিংয়ে এনেছে। ২০ কোটি টাকা দিয়ে কিনব, ১০ কোটি টাকা ছড়াব। পাঁচ বছর থাকলে দুইশ, আড়াইশ কোটি টাকা লাভ করব, সোজা হিসাব। এমপি চরিত্র নষ্ট হচ্ছে এজন্য। কাজেই আনুপাতিক হারে নির্বাচন করেন।’
নতুন তত্ত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ, তাদের দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট চালান। কোনো ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কিচ্ছু নেবেন না। তাদের মনকে দৃঢ় করেন। তারা দেশের মালিক। তাদের ওপর দায়িত্ব দেন। এখানে ভোটকেন্দ্রগুলো স্থায়ী করেন। আড়াই লাখ ভোটকেন্দ্র করেন। প্রতি কেন্দ্রে পাঁচশর বেশি ভোটার থাকবে না। ভোটার ক্লাব করেন। ১১ জনের নির্বাহী কমিটি থাকবে। পাঁচজন নারী, ছয়জন পুরুষ; তারা ভোটটা চালাবে। ছাত্র-জনতা শিক্ষিত যারা আছেন, তারা স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা দেখবেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। এক ঘণ্টা লাগবে গুনতে। গোনার পরে সেটা মোবাইলে ইলেকশন অফিসে চলে যাবে। উপজেলা, জেলা সব পর্যায়ে রেজাল্ট থাকবে। সেখানে ফল পাল্টানোর সুযোগ থাকবে না।’
আনুপাতিক হারে নির্বাচন পদ্ধতি তুলে ধরে সাবেক এই সিইসি বলেন, ‘ভোট দেবে মানুষ দলকে। যখন দলকে দেবে, তখন পয়সা খরচের বিষয় থাকবে না। ১২ কোটি ভোটার, ৯ কোটি লোক ভোট দিল। ১৫টা দল আছে। ভোট যদি ৯ কোটি হয়ে থাকে, ৩০০ আসন থাকলে তিন লাখ ভোট হলে হয়। কাজেই কোনো দল তিন লাখ পেলে সংসদে একজন, ছয় লাখ হলে দুজন, এভাবে আসন পাবে। ভোটের আগে তৃণমূলে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করে দলগুলো ইসিকে তালিকা দেবে। ইসি লোকটা ভালো কি মন্দ, পাবলিক মতামত নেবে। অবজেকশন এলে তাকে বাদ দেওয়া হবে। ফুটবলের প্লেয়ার বদলের যেমন সুযোগ থাকে, তেমন করে বছরে পাঁচজন বদলের সুযোগ থাকবে। ৩০০ সংসদীয় আসন থাকবে না। সারা দেশ হবে একটা আসন।’
সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনে একবারে ভোটগ্রহণেরও প্রস্তাব করেন আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, ‘আমি ছয়টা নির্বাচন করি। সংসদ নির্বাচনের যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে, তার প্রতিনিধি ইউপিতে হবে। কাজেই এক নির্বাচনেই সব শেষ করা যায়। এত কাগজ নষ্ট, এতে ব্যয় কমে আসবে।’
অগাধ ক্ষমতা প্রয়োগে সমস্যা ছিল : নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ও আদালতের মাধ্যমে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অগাধ ক্ষমতা প্রয়োগে সমস্যা ছিল। এজন্য এই সমস্যা দূর করতে হবে। গতকাল নির্বাচন ভবনে সংস্কার কমিশনের সঙ্গে ইসির প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় শেষে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এসব কথা বলেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবের নেতৃত্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা মতবিনিময় করেছি। উনারা আগে নির্বাচন করেছেন, ভবিষ্যতেও করবেন। উনারা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কী বিষয়ে আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার, সে মতামত নিয়েছি আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা বিষয় সুস্পষ্টভাবে এসেছে। সেটা হলো আমাদের আইন-কানুন বিধি-বিধানের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, সেগুলো দূর করা দরকার। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রয়োগ। নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ও আদালতের মাধ্যমে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের একটা রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের খাতিরে তারা বিধি-বিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারে। অগাধ ক্ষমতা দেওয়া ছিল, তবে এটা প্রয়োগের সমস্যা ছিল। এই সমস্যাটা দূর করতে হবে।’
ইসি সচিব শফিউল আজিম বলেন, ‘সংবিধানেরও অঙ্গীকার হলো, গণপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এটা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানই দায়িত্ব দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। এটা মনে রাখতে হবে এটা সংস্কার করা... এখানে অনেকগুলো ভালো জিনিস আছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে দুর্বলতা আছে, আমরা সেগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে গণমাধ্যমসহ অংশীজনের কী অভিজ্ঞতা আছে, আমরা সেগুলো নিয়েও আলোচনা করেছি। হস্তক্ষেপ কোথা থেকে কীভাবে হয় এবং আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে নির্বাচনকে কেউ হস্তক্ষেপ করে, এগুলো নিয়ে আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি।’
