ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষে গতকাল বুধবার রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গতকাল দুপুর আড়াইটায় শুরু হওয়া সংঘর্ষ চলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। দুপক্ষের সংঘর্ষে পুলিশ, শিক্ষার্থী, পথচারীসহ ৩০ জনের অধিক আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামাতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক দফা টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার ক্লাস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা সিটি কলেজ প্রশাসন। গতকাল রাতে কলেজের ওয়েবসাইটে নোটিস দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক কাজী নেয়ামুল হকের সই করা ওই সংক্ষিপ্ত নোটিসে বলা হয়েছে, ‘অনিবার্য কারণে আগামীকাল (আজ) সব ক্লাস বন্ধ থাকবে।’
পুলিশ বলছে, তিন দিন থেকেই দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তারই ফল হিসেবে গতকাল দুপুর আড়াইটা থেকে সংঘর্ষে জড়ান দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের নিউ মার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার তারিক লতিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আড়াইটার দিকে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা কলেজের বিজয় একাত্তর বাসে হামলা চালায়। এর আগে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সিটি কলেজের বাইরে হামলা চালিয়ে থাইগ্লাস ভাঙচুর করেন। তারপরই মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হন তারা। সংঘর্ষ থামাতে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক দফায় টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে সংঘর্ষ থামলে ওই এলাকা শান্ত হয়ে যায়। যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।’
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে একটি সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। সেখান থেকে দাবি তোলা হয় সিটি কলেজকে সায়েন্সল্যাব এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার। এ ছাড়া দায়িত্বরত পুলিশ ও সেনাসদস্যরা ঢাকা কলেজের ভেতরে ঢুকে ভবনে হামলা ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করার অভিযোগ তুলে পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থীর আইডি কার্ড কেড়ে নেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সিটি কলেজ এলাকায় ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। পরে ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থী সিটি কলেজে আক্রমণ করে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলেন। দুপুরের পর ঢাকা কলেজের একটি বাস সিটি কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কলেজের শিক্ষার্থীরা ওই বাসে হামলা ও ভাঙচুর চালান। এ খবর ঢাকা কলেজে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা জোটবদ্ধ হয়ে সিটি কলেজে যান। এরপর সংঘর্ষ শুরু হয়। যদিও দুপক্ষই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দেখা যায়, সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের কলেজের সামনের সড়কে ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরপরই তারা একপক্ষ অন্যপক্ষকে ধাওয়া দিচ্ছে, ইটপাটকেল ছুড়ছে। ভুয়া ভুয়া বলে সেøাগান দিচ্ছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা দুপক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও কোনো পক্ষই থামছিল না। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রথমে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের দিকে টিয়ার শেল ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা সুযোগ বুঝে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করেন। সে সময় সিটি কলেজ শিক্ষার্থীদের দিকেও টিয়ার শেল ছোড়ে পুলিশ।
বিকেল ৫টার পর সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কলেজ কম্পাউন্ডের ভেতর ঢুকে যান। সেই সময় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা এসে সিটি কলেজের গেটের সামনে থেকে ভেতরে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। জবাবে ভেতর থেকে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এতে কলেজটির সামনে থাকা পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, অভিভাবক ও উৎসুক অনেকে আহত হয়েছেন। এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কলেজের ভেতরে ঢুকতে চাইলেও শিক্ষার্থীরা তাদের প্রবেশ করতে দেননি।
অন্যদিকে কলেজের ভেতরে আটকেপড়া অনেক শিক্ষার্থীর বাবা-মা উদ্বিগ্ন হয়ে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। অনেকেই সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা জানিয়েছিলেন।
ঢাকা সিটি কলেজের গেটে কথা হয় উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী গাজী রাহিবের বাবা গাজী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। এই অভিভাবক বলেন, ‘সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে আমার ছেলেকে নিতে এসেছি। মোবাইল ফোনে জানিয়েছে কলেজের বাইরে মারামারি হচ্ছে, সে বের হতে পারছে না। পরে আমি তাকে নিতে আসি।’
প্রায় চার ঘণ্টার সংঘর্ষে ত্রিশের অধিক শিক্ষার্থী ও পথচারী আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) হাসপাতালে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমসি পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. ফারুক। তিনি বলেন, মারামারির ঘটনায় বেশ কয়েকজন হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
ঢাকা কলেজের সংবাদ সম্মেলন : গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৭টা ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে কলেজ কর্র্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘এখানে (ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে) যখন সেনাবাহিনী এসে ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন পুলিশ ও সেনাবাহিনী একসঙ্গে এসেছিল। আমাদের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক ইকবাল হোসেন আহত হন, দুদিকে ঢিলের মাঝখানে উনার হাতে এসে ঢিল লাগে। আমাদের ছাত্ররা উনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের (ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে) ভেতরে পিটুনির ফলে আমাদের কতজন ছাত্র আহত হয়েছেন, এর হিসাব এখনো বলা যাচ্ছে না। আশা করি, ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে এর একটা সুষ্ঠু সমাধান করবেন, যাতে আমাদের ছাত্ররা শান্ত থাকে ও আমাদের কার্যক্রম সচল রাখা যায়।’
পরে লিখিত বক্তব্যে দাবিগুলো তুলে ধরেন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক আ ক ম রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সংঘর্ষে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষক আহত হয়েছেন। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা কলেজের স্থাপনায় সেনাবাহিনী সরাসরি হামলা ও ভাঙচুর করেছে, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এ হামলায় জড়িত প্রশাসনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা, যারা এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের পদত্যাগ করতে হবে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, এর আগে সব বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সিটি কলেজের কিছু সন্ত্রাসী শিক্ষার্থী দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় এবং পরবর্তী সংঘর্ষ এড়াতে সিটি কলেজকে এখান থেকে স্থানান্তর করতে হবে। সিটি কলেজের যেসব শিক্ষক এই নিন্দনীয় ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও নির্দেশদাতা, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
জানতে চাওয়া হলে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে নিয়ম মেনে কাজ করেছি। ছাত্ররা সংঘর্ষে জড়ালে আমরা তো বসে থাকতে পারি না। তারা যে অভিযোগ তুলে পদত্যাগ চেয়েছেন, সেটার ব্যাপারে আর কী বলব? কী বলার আছে, বলেন তো!’
