জয়পুরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে আলুর চাষ। তবে এবার আলু চাষ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, কাক্সিক্ষত দামে আলুবীজ পাচ্ছেন না তারা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০ কেজির প্রতি বস্তা আলুবীজ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে প্রতি বস্তা সারে ২০০-৪০০ টাকা বাড়তি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বড় ডিলাররা জানান, তারা নন বরং খুচরা বিক্রেতা ও ছোট ব্যবসায়ীরা দাম বেশি নিচ্ছেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, জেলায় চলতি মৌসুমে আলুবীজ ও সারের কোনো সংকট নেই। বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে জানা গেছে, জয়পুরহাটে প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। বিগত বছরগুলোয় জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হলেও এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার হেক্টর। এ আলু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হয় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। পাশাপাশি জেলায় ১৯টি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ বীজআলু ও খাবারের আলু সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমান জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে আলুর চাষ। কৃষকরা মাঠে মাঠে আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করছেন বীজআলু। পাশাপাশি সারের দামও বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
এবার ব্র্যাক সিডের গ্রানুলা, কারেজ, বারি আলু-৬২, এস্টেরিক্স, ডায়মন্ড, সানসাইন, ব্র্যাক আলু-৭ ও কার্ডিনাল জাতের এ, বি ও সি গ্রেডের ৪০ কেজির বীজআলুর প্রতি বস্তার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৯২০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। তবে কিছু ব্যবসায়ী আলুর কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এসব আলুর বস্তা বিক্রি করছেন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া বিএডিসি ও অন্যান্য কোম্পানির আলুর বীজ ২ হাজার ৬০০ টাকার বদলে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। এদিকে সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজির টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, এমওপি ১ হাজার টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করছেন ২০০-৪০০ টাকা অতিরিক্ত দামে। তবে ইউরিয়া সারের কোনো সংকট নেই। সংকটের কারণে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বীজআলু ও অন্যান্য সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অসহায় কৃষকরা। বাজার মনিটরিং জোরদার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি তাদের। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রির কঠোর নির্দেশনা থাকলেও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে তা কাজে আসছে না।
হিচমী মন্ডলপাড়ার কৃষক আবদুর নুর বলেন, ‘৩ হাজার ১৮০ টাকা দরের ব্র্যাক সিডের আলু কিনতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পর ৪ হাজার ২০০ টাকা দাম নিয়েছে। সবাই দাম বেশি নিচ্ছে।’
মোল্লাপাড়ার কৃষক আবদুল হক বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার ২০০-৪০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ডিলার বা দোকানদারদের কাছে গেলে তারা লুকিয়ে রেখে বলছেন, সার নেই। আবার বেশি দাম দিলে ঠিকই সার মিলছে।’
শহরের বাটার মোড়-জামালগঞ্জ রোডের ডিলার গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত দামে বীজ দিচ্ছি। ছোট বা অসৎ ব্যবসায়ীরা দাম বেশি নিচ্ছেন। এজন্য কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের কাছে এসেছিলেন। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য কিনতে পারেন, এজন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে।’
এ বিষয়ে জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে জেলায় আলুবীজ বা সারের কোনো সংকট নেই। আমরাসহ জেলা প্রশাসন নিয়মিত বাজার মনিটর করছি। কেউ যদি সিন্ডিকেট করে বেশি দামে এসব বিক্রি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক আফরোজা আকতার চৌধুরী বলেন, ‘আলুবীজ ও সারের দাম বেশি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত টিম উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
