রাজধানীতে বই পড়া ও পড়ানোর নতুন উদ্যোগ

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:৫৮ এএম

বই জ্ঞানের প্রতীক। বই জ্ঞানের ধারক। বইয়ের মাধ্যমেই মানুষের অর্জিত জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। সিডনি স্মিথ সেজন্যই বলেছিলেন, ‘গৃহের কোনো আসবাবই বইয়ের মতো সুন্দর নয়।’ তবে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেই নয়, বই পড়া ছিল সাধারণ মানুষের অন্যতম বিনোদনও। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, আজকাল কেউ আর বই পড়ে না। বিনোদনের মাধ্যমের প্রাবল্যে এই অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। নানা সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করে আর ট্রেন্ডিংয়ের দৌড়ে থাকতে থাকতে বর্তমানে হয়তো সত্যিই বই পড়ার অবসর মানুষের নেই।

কিন্তু বই শুধু বিনোদনের জন্যই পঠিত হয় না, সে কথা বলাই বাহুল্য। মনীষী দেকার্ত বলেছেন, ‘ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর মহৎ লোকের সঙ্গে আলাপ করা।’ মানুষকে বইমুখী করতে এবং মহত্তম মানুষদের চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে রাজধানী ঢাকার কিছু বইপড়ুয়া শুরু করেছেন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। তারা ধানম-ি লেকে স্থাপন করেছেন উন্মুক্ত পাঠাগার। এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে জাকিয়া রায়হানা রূপার হাত ধরে। সেই শুরুর গল্পটিও কম চমকপ্রদ নয়।

একলা চলো রে

জার্মানপ্রবাসী বাংলাদেশি যুবক মানো বিশ্বাস ২৮ অক্টোবর তার ফেসবুক পেজ মানো অন দ্য ওয়েতে লিখেছিলেন, ‘জার্মানিতে রাস্তাঘাটে অথবা পার্কে এমন পাবলিক লাইব্রেরি অনেক দেখা যায়। পথচলতি মানুষ সম্পূর্ণ ফ্রিতে এখানে বই পড়তে পারেন কিংবা বই পড়ার জন্য বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। নিজের বাড়িতে বই থাকলে শেয়ারও করা যায়। পড়া হয়ে গেলে ফের যথাস্থানে বইপাঠকরা রেখে দিয়ে যান। এখানে না আছে কোনো নিরাপত্তাকর্মী, না আছে কোনো মেম্বারশিপের ব্যবস্থা। কেউ চুরিও করে না। জার্মানি ফুটবলের দেশ, খেলাপ্রেমীদের জগৎ আবার তার পাশাপাশি তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা শ্রেষ্ঠ। অনেক সময় বনে-জঙ্গলে আর নদীর পাশেও এমন লাইব্রেরি দেখেছি আমি।’ (মানো বিশ্বাসের ভাষা ও বানানরীতি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে)

এই স্ট্যাটাসটি চোখে পড়ে রাজধানীর ঢাকার গৃহিণী জাকিয়া রায়হানা রূপার। তিনি ৯ নভেম্বর এই পোস্টটি শেয়ার করেন। মানো বিশ্বাসের স্ট্যাটাসে যে অলিখিত হাহাকার ছিল তা হলো, আহা, বাংলাদেশেও যদি এমন লাইব্রেরি থাকত। সেই একই হাহাকার নিয়েই রূপাও শেয়ার দিয়েছিলেন। পরে তার মনে হলো, তিনিও তো বাড়ির পাশের ধানমণ্ডি লেকে এমন একটি বুক কেস স্থাপন করতে পারেন, যেখান থেকে বই নিয়ে পার্কের দর্শনার্থীরা পড়বেন। পড়ার পরে কেসে রেখে দেবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। সহযোগিতা নেন বন্ধু রাশেদুল ইসলাম রানার। তার প্রতিষ্ঠান সিমবায়োসিস আইটিকে দায়িত্ব দেন বুক কেস তৈরির। তৈরি হলে সহযোগীদের নিয়ে স্থাপন করেন ধানম-ি লেকের প্রথম উন্মুক্ত পাঠাগারের প্রথম বুক কেস। এখানেই শেষ নয়। বরং বিস্ময়ের শুরু।

ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল

ধানমন্ডি লেকে বুক কেস স্থাপনের বিষয়টি জানিয়ে ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট দেন। সঙ্গে আহ্বান জানান, আগ্রহীরাও যেন ধানমন্ডি লেকে বা নিজেদের চারপাশে এমন ছোট ছোট বুক কেস বা শেলফ স্থাপন করে বই পড়তে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে, বই পড়তে সহযোগিতা করতে। তাকে নিরাশ হতে হয়নি। তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন অনেকেই। পরে তিনি খরচের হিসাব উল্লেখ করে জানান এমন একটি বুক কেস বইসহ স্থাপন করতে সব মিলিয়ে খরচ হবে ছয় হাজার টাকা। এরপর সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছেন কামাল হোসাইন সুজন, ফাইজুর রহমান সুজন, মিনহাজ, সদ্য সমুজ্জ্বল, আবু সাদাত মো. সায়েম, বাবলি হক, অপু খসরু মজুমদার, রাশেদুল ইসলাম, উৎপল ব্যানার্জি, রাসেল, জাফর ফিরোজ, হিমিকা আফরাহ আদিবা, তাসমিয়া তুলিসহ অনেকে। তিনি নিজেও যুক্ত হয়েছেন এই প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপে। ফলে কয়েক দিন পর ধানম-িতে যুক্ত হয়েছে আরও তিনটি বুক কেস। যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ছয়টি। বুক কেসগুলো লেখা রয়েছে সহযোগিতাকারীর নাম, বই পড়ার ও বই নেওয়ার নিয়ম। বুক কেসগুলো এমনভাবে তৈরি, যেন তা বৃষ্টিতে নষ্ট না হয়। মানসম্মত বইও যেন সেখানে থাকে, সে ব্যাপারটিও লক্ষ রাখার কথা জানিয়েছেন রূপা।

ছড়িয়ে গেছে দিকে দিকে

জাকিয়া রায়হানার এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখে অনেকেই উৎসাহিত হয়েছেন। অনেকেই নিজেদের বাড়ি, অফিস ও আশপাশের পার্কে এমন উন্মুক্ত পাঠাগার তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে মিরপুর ৬০ ফিটে নিজের বাড়ির নিচে একটি শেলফ স্থাপন করেছেন নাজমুল রোমেন। যেখান থেকে ফেরত দেওয়ার শর্তে যে কেউ পড়ার জন্য নিয়ে যেতে পারবেন।

আপ্লুত দর্শনার্থীরা

ধানমণ্ডি লেকে সারা দিনে বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ আসেন। তারা নতুন এই উদ্যোগ দেখে ভীষণ আনন্দিত। গৃহিণী আফরোজা জানালেন, ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এখানে আসেন। চুপচাপ বসে থাকতে হতো। এখন তিনি বই পড়ছেন। সকালের মিঠে রোদে বসে বই পড়তে ভালোই লাগছে তার। মানুষের এমন উৎসাহ দেখে ভীষণ আনন্দিত ও আশাবাদী জাকিয়া রায়হানা রূপা। সবার হাতের কাছে পড়ার বই থাকবে এটিই তার চাওয়া। তিনি চান এই উদ্যোগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে যাক সারা বাংলাদেশে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত