ডা. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের (ডিএমআরসি) অভিজিৎ হালদার (১৮) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল রবিবার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে শিক্ষার্থীরা। ভুল চিকিৎসা ও অনিয়মের অভিযোগে মাহবুবুর রহমান কলেজ, দনিয়া কলেজসহ আশপাশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অন্তত এক হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী কলেজে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। অন্যদিকে কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে হামলার প্রতিবাদে বিকেলে পাশের সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে হামলা চালিয়ে শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে লাঠিসোঁটা হাতে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়। গত ১৮ নভেম্বর অভিজিৎ ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হয়ে ন্যাশনাল মেডিকেলে মারা যায়। ঘটনার দুদিন পর ভুল চিকিৎসায় অভিজিতের মৃত্যুর অভিযোগে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে এলে কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা তাদের বাধা দেয় ও হামলা চালায়। পুলিশের টিয়ার শেলে ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা সেদিন চলে যায়। পরে গতকাল মাহবুবুর রহমান কলেজ ও অন্য কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ঘেরাও করতে এলে সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা পিছু হটলে অন্যপক্ষের শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী কলেজে ঢুকে পড়ে। ওই সময় কলেজের উপাধ্যক্ষের কক্ষসহ অধিকাংশ কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। কলেজ প্রাঙ্গণে থাকা একটি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সে, দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। শিক্ষার্থীদের কলেজের ট্রফি, চেয়ারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যেতেও দেখা যায়। পরে শিক্ষক ও স্টাফদের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা কলেজ প্রাঙ্গণ ছেড়ে যায়। এরপর কলেজে থাকা পরীক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বের হয়।
এরপর কলেজটিতে চলমান অনার্স প্রথম বর্ষের ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সোহরাওয়ার্দী কলেজে পরীক্ষা দিতে আসা কবি নজরুল কলেজের ছাত্র মুফতি বলেন, ‘পরীক্ষা দেড় ঘণ্টা চলার পর আমরা ভাঙচুরের শব্দ পাই। আড়াইটা নাগাদ শিক্ষকরা পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন।’
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ফটকের ভেতরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিক্ষোভরত ছাত্রদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
এদিকে অভিজিতের মৃত্যুর বিষয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. রেজাউল হক বলেন, ‘শিক্ষার্থী অভিজিৎ হালদারের মৃত্যু কেন্দ্র করে হাসপাতাল ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে ডা. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে হাসপাতালে পরিচালকের কক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ছাত্র প্রতিনিধি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়। মৃত্যুর বিষয়ে তদন্তে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। আশা করছি, দ্রুত সময়ে কমিটি প্রতিবেদন দেবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ডা. রেজাউল হক আরও বলেন, ‘গত ১৬ নভেম্বর সকালে অভিজিৎ হালদার নামে এক শিক্ষার্থীকে জরুরি বিভাগে আনা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ডেঙ্গুজ¦র ধরা পড়ে। পরে তাকে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা চলাকালে তার অবস্থার অবনতি হলে রোগীর অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সব চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও ১৮ তারিখ মারা যায় অভিজিৎ। এখানে আমাদের কোনো ত্রুটি কিংবা অবহেলা ছিল না। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত্যু-পরবর্তী মরদেহ হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে রোগীর আত্মীয়কে বুঝিয়ে দেয় এবং রোগীর সম্পূর্ণ বিল স্থগিত রাখা হয়।’
হামলার বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাকলী মুখোপাধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। একটি পাবলিক পরীক্ষা চলমান ছিল। অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ক্যাম্পাস তান্ডব চালিয়ে হামলা করা হয়েছে। কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক চুরি করে নিয়ে গেছে তারা। এখানে মিডিয়া ছিল, সবার কাছেই ভিডিও আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এগুলো দেখলে বুঝতে পারবে কারা এমন হামলা চালিয়েছে।’
কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে হামলার প্রতিবাদে বিকেল ৫টার দিকে পাশের সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে হামলা চালিয়ে শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষার্থীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও কর্মীরা জানান, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষসহ অন্তত ৫০টি কক্ষে ভাঙচুর করা হয়েছে। ক্যান্টিনে হামলা চালিয়ে টাকা লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয়তলার একটা শিক্ষক কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেন্ট গ্রেগরি কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমরা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিয়েও সহযোগিতা পাইনি। ঘটনার আড়াই ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ আসেনি।’
কলেজের ফাদার ব্রাদার প্লাসিড পিটার রিবেরু সিএসসি বলেন, ‘কলেজ ছুটি হয়েছে দুপুর ২টায়। আমরা অফিশিয়াল কাজ শেষ করে বিকেল ৪টার মধ্যে সবাই চলে গেছি। পরে খবর পেয়ে এসে দেখি এই অবস্থা।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) তালেবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ন্যাশনাল মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ডিএমআরসি কলেজের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরেই এ ঝামেলা চলছিল। দুপুর (গতকাল) থেকে এটি নতুন করে শুরু হয়। সন্ধ্যার পরই পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আপাতত ওই এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে। এ ঘটনায় আমরা হতাহতের খবর পাইনি। কেউ গ্রেপ্তার বা আটকও নেই।’
তেজগাঁওয়ে বুটেক্স ও ঢাকা পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ : রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। গতকাল রাত ১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিটাক মোড়ে এই সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বেগুনবাড়ী পোস্ট অফিস থেকে বিএসটিআই মোড় পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, বুটেক্সের আজিজ হল ও ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের লতিফ হলের শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এরপর কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে কী নিয়ে এ সংঘর্ষের শুরু হয় তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পুলিশ জানায়, বিটাক মোড় এলাকায় বুটেক্স ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। সেখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ সংঘর্ষের ঘটনায় আহত বেশ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান বলে জানা গেছে। তবে তাদের কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি গাজী শামীমুর রহমান বলেন, ‘বুটেক্স ও পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। তবে সংঘর্ষের কারণ জানা যায়নি। ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’
