গায়ের জোরে একতরফা নির্বাচন করতে চাই না

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৯ এএম

গায়ের জোরে একতরফা নির্বাচন চান না বলে জানিয়েছেন নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। তিনি বলেন, একতরফা নির্বাচন করে দেশের বারোটা বেজে গেছে। গায়ের জোরে নির্বাচন করলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। নতুন নির্বাচন কমিশন একটা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন চায়। যেখানে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সমান সুযোগ) তৈরি করে দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলো নিয়ে কী ভাবছে কমিশন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল নিয়ে সিরিয়াস বিতর্ক চলছে। এ বিতর্কের ফয়সালা হোক। আমরাও অপেক্ষা করছি। ফয়সালা কী আসে দেখি। বিগত সরকারি দল ও তাদের সহযোগী সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমরা কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এসব কথা বলেন।

এর আগে দেশের ১৪তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে শপথ নিয়েছেন এ এম এম নাসির উদ্দীন। তার সঙ্গে অন্য চার কমিশনারও শপথ নিয়েছেন। দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে তাদের শপথ পড়ান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

গত বৃহস্পতিবার সিইসি ও চার কমিশনার নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। মতবিনিময় সভা : শপথ নেওয়ার পর গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আসেন সিইসি নাসির উদ্দীন। তার সঙ্গে অন্য চার কমিশনারও ছিলেন। তবে তারা কোনো বক্তব্য দেননি।

সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে নির্বাচন করার প্রশ্নে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, এ সরকার সেই সরকার নয় যে চাপিয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার চাপিয়ে দিয়েছে, কারণ তাদের দলীয় এজেন্ডা ছিল। কিন্তু ড. ইউনূস বিভিন্ন সময় বলেছেন তার কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তিনি একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা দিয়ে মুক্ত হতে চান। সরকারের তরফ থেকে কোনো চাপ নেই। আমাদের স্বাধীনতা দেওয়া আছে।’

প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে আগামী নির্বাচনের আয়োজন করা হবে জানিয়ে নতুন সিইসি বলেন, সরকার অনেক সংস্কার কমিশন করেছে। নির্বাচনের সঙ্গে এসব সংস্কারের সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কারে বিষয়গুলো সমাধান হলে তারপর নির্বাচনের তারিখ বা অন্যান্য আয়োজন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে তাদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন।

কবে নাগাদ নির্বাচন হবে, এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল দায়িত্ব নিলাম। তবে যেকোনো নির্বাচন করতে গেলে কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ থাকে। আর বিশেষ করে কিছু সংস্কার প্রয়োজন। যদিও এটা চলমান প্রক্রিয়া। তবুও কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার করতেই হবে। অনেকে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন চান, কেউ আবার দ্বিকক্ষের কথা বলছেন। অনেকে আবার প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট চান। এ ধরনের বিষয়গুলো ফয়সালা না হলে আমরা কীভাবে ভোট করব।’

নির্বাচন করার জন্য যে সংস্কারগুলো প্রয়োজন সেগুলো করতে হবে উল্লেখ করে নতুন সিইসি বলেন, এগুলো ছাড়া নির্বাচন করা যাবে না। নাসির উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের সব প্রচেষ্টা থাকবে একটা পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য। যে পরিবেশে সব ভোটার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবেন। সেই পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করব। এটাই আমাদের ওয়াদা। এর জন্য যা যা করার দরকার আমরা তাই করব।’

মতবিনিময়ের আগে সরানো হলো শেখ মুজিবের ছবি : মতবিনিময়ের আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মেলন কক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নামিয়ে ফেলেন কমিশনের কর্মীরা।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নির্বাচন কমিশনের সম্মেলন কক্ষে তাদের আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভায় আসার কথা ছিল। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা ও মধ্যাহ্নভোজের কারণে দেরি হয়। পরে বিকেল ৪টার দিকে কমিশনের দুই কর্মী নির্বাচন ভবনের পঞ্চমতলায় সম্মেলন কক্ষের দেয়ালে ঝোলানো বঙ্গবন্ধুর ছবিটি খুলে ফেলেন।

‘শপথের সম্মান রাখতে চাই’ : সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ প্রথমে সিইসিকে শপথ পড়ান। এরপর অন্য চার কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবদুর রহমানেল মাসুদ, তাহমিদা আহমদ ও আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহকে শপথ পড়ান তিনি।

শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আজিজ আহমদ ভূঁঞা।

শপথ নিয়ে নতুন সিইসি সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের প্রবেশপথে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ^াসযোগ্য নির্বাচন দেওয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সবার সহযোগিতা নিয়ে এ জাতিকে একটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দেব।’

তিনি বলেন, ‘ফার্স্ট অব অল শপথ নিয়েছি। শপথের সম্মানটা আমি রাখতে চাই। এটাকে (শপথ) সমুন্নত রাখতে চাই। আমি এ দায়িত্বকে নিজের জীবনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছি। অপরচুনিটি টু সার্ভ দ্য নেশন। দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা অবাধ ও নিরপেক্ষ একটা নির্বাচনের জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আন্দোলন করেছে বিগত বছরগুলোতে এবং অনেকে রক্ত দিয়েছে।’

সিইসি বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী। আমার টিম আছে, আমরা সবাই মিলে, সবার সহযোগিতা নিয়েই কিন্তু করতে (নির্বাচন) হবে। আমরা একা পারব না। আপনাদের (গণমাধ্যম) সহযোগিতা লাগবে। দেশবাসীর সহযোগিতা লাগবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা লাগবে।’

এক প্রশ্নে নাসির উদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে নানা পদ্ধতির প্রস্তাব আসছে। এটা যদি সংবিধানে ফয়সালা না হয়, আমরা নির্বাচনটা করব কীভাবে? নির্বাচন করতে গেলে নতুন প্রজন্ম, যারা ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে বছরের পর বছর, তাদের তো ভোটার তালিকায় আনতে হবে। ভোটার তালিকা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোথায় কোথায় সংস্কার দরকার হবে, ইন্টারভেনশন দরকার হবে, যেহেতু নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটা কমিশন কাজ করছে। তাদের পরামর্শ আসুক, আমরা দেখি কোনটা কোনটা গ্রহণযোগ্য হয়। যেগুলো গ্রহণযোগ্য হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে আমাদের।’

সংবিধান নিয়ে সংস্কার কমিশন কাজ করছে জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘আমি ও আমার টিম সংবিধানের প্রোডাক্ট। সংবিধান যদি ঠিক না হয়, তাহলে আমাদের যাত্রা এলোপাতাড়ি হয়ে যাবে। সুতরাং এ কার্যক্রমও শেষ হোক। সব সুপারিশ আসুক। বেশিদিন তো নেই। সরকার তো বলেছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় (সংস্কারের সুপারিশ) দিয়েছে। অতি অল্প সময়, আপনারা আশ্বস্ত থাকুন। আমাদের নিয়ত সহি। আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এটি (নির্বাচন) করব।’

দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ মনে করেন এমন প্রশ্নে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উল্লেখ না করে নাসির উদ্দীন বলেন, ‘এরকম বিশেষ পরিস্থিতি আমার চাকরি জীবনে বহু আসছে। আমি তথ্য, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলাম। বহু চ্যালেঞ্জ দেখেছি এবং সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মতো সাহস আমার আছে। যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ আসুক, সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সেটি ওভারকাম করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত