নিধনে ব্যর্থতায় বর্ষার ডেঙ্গু শীতেও

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৩১ এএম

মশক নিধনে ব্যর্থতার করণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ও হেমন্ত সব ঋতুতেই দেখা দেয় এডিস মশার উপদ্রব। অথচ এই মশা মারাতে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। প্রতিবছর বাজেট বাড়লেও কমছে না এডিস মশা।

এডিস একসময় শুধু বর্ষাকালে বংশ বিস্তার করলেও এটি এখন সারা বছরই ভোগাচ্ছে। সে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি না থাকায় এখনো ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সঠিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকার কারণে ডেঙ্গু প্রাকৃতিকভাবেই বাড়ে-কমে। এর ওপর কোনো সংস্থা এখনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মশক নিধন কার্যক্রমে জবাবদিহি না থাকার কারণে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, মূলত মশক নিধনে ব্যর্থতার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণহীন। তা ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবনসহ স্থাপনা নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ডেঙ্গু রোগীর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। যার কারণে এখনো থামছে না ডেঙ্গুর দাপট।

এডিস মশা বাঁচে ৪২ দিন

চলতি বছর ঢাকায় সবশেষ বৃষ্টি হয়েছিল ২৭ অক্টোবর। আর একটি এডিস মশা স্বাভাবিকভাবে ৪২ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সে হিসেবে গত মাসে লার্ভা থেকে জন্ম নেওয়া এডিস মশাগুলো এখনো বেঁচে আছে। সিটি করপোরেশনের সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই নাগরিকদের কামড় দিচ্ছে। আর এই মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে শত শত মানুষ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বারবার সতর্ক করা হলেও কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। আমরা আগেই বলেছিলাম নভেম্বর মাসে ডেঙ্গু বাড়তে পারে। মশা এবং রোগী ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হওয়ার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় জন্ম নেওয়া মশা এখনো আছে। তা ছাড়া ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখনো এডিসের লার্ভা আশঙ্কাজনক হারে পাওয়া যাচ্ছে। যার ফলে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। বড় বড় বিল্ডিংয়ের ড্রেনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবনে লার্ভা। যেসব এলাকায় পানির সংকট, সেখানকার মানুষ পানি জমিয়ে রাখছে দিনের পর দিন। সেখানেও এডিস মশা বংশ বিস্তার করছে।

ঢাকায় মৃত্যু ৬৯ শতাংশ

গত দুদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ১৭ জন মারা গেছে ঢাকায়। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

উল্লিখিত দুদিনে সারা দেশে ১ হাজার ৯৬৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকাতেই ১ হাজার ৩৬ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৭১২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৪৯ হাজার ৪৮২ জন। মারা যাওয়া ৪৫৯ জনের মধ্যে ৩১৬ জনই ঢাকার। পরিসংখ্যানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগের জেলাগুলো আন্তর্ভুক্ত।

হিসাব করে দেখা গেছে, গত দুদিনের মৃত্যুর ৭৭ শতাংশ হয়েছে ঢাকায়। আর মৃত্যুর প্রায় ৬৯ শতাংশ ঢাকায়। রোগীর ৫৮ শতাংশই ঢাকার। ২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দেশের অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি ছিল। তবে গত বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু চলতি বছর আবারও ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী।

অথচ মশক নিধন থেকে শুরু করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় বাজেট হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পাশের এলাকার জন্য। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছাড়াও গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকাতেও মশক নিধনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। মশক নিধনের যান-যন্ত্রপাতির দিক থেকেও ঢাকা সবার চেয়ে এগিয়ে। এরপরও মশক নিধনে বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণে এই এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শত শত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মশার পেছনে ১৩০০ কোটি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৩ বছরে মশার পেছনে ১৩০০ কোটি টাকা খরচ করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বাজেট ধরা হয়েছে ১৬৭ কোট টাকা। এর মধ্যে ডিএনসিসি ১২২ কোটি এবং ডিএসসিসি ৪৫ কোটি বরাদ্দ করেছে এ খাতে। গত বছর ১০১ কোটি টাকা বাজেট করেছিল সংস্থা দুটি। এর আগে এক যুগে শুধু ঢাকায় অন্তত ১২০০ কোটি টাকা খরচ হয় এ খাতে।

যা করছে সিটি করপোরেশন

ঢাকায় এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় সারা বছরই সকাল-বিকেল ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন। সকালে নালা, ডোবা, লেক ও ময়লা-আবর্জনায় (মশার বংশবিস্তার করার জায়গায়) লার্ভি সাইট প্রয়োগ করা হয়। বিকেলে উড়ন্ত মশার জন্য ওষুধ ছিটানো হয়। তা ছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়। তবে গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে মশক নিধন কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটাচ্ছি। তা ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নতুন রোগীর বাসার চারপাশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা মশককর্মীদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। কারও বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বলেন, ‘মশা নিধনে বছরের শুরু থেকে পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা সেটি করপোরেশনকে জানাতে বলা হয়েছে। আমাদের কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং করছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত