প্রাক মুঘল যুগে ‘ঢাকা’ পরিচিত ছিল ‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি’ হিসেবে। এরপর ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বলা হতো ‘মসজিদের শহর ঢাকা’। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই মসজিদের শহর একসময় রূপ নিল ‘রিকশার শহর’ হিসেবে। তারপর হলো ‘যানজটের শহর’, ‘ভোগান্তির শহর’ ঢাকা। আর এখন ২০২৪ সালে, তার নাম হয়েছে ‘দাবির শহর’। এ রকম নামকরণের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে একের পর এক দাবির ধারাবাহিক ঘটনা যা আজও চলছে। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী শাসনের পতনের পর শুরু হয়েছে একের পর এক দাবি নিয়ে আন্দোলন। চলতি বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন পার না হতেই একের পর এক দাবি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রাখা হচ্ছে সরকারকে। হঠাৎ যেন উৎকণ্ঠার ছাপ এসে ভর করেছে নগরবাসীর জীবনে। কখন, কোথায় কী ঘটবে জানা নেই কারও। ছোটখাটো ঘটনা নিয়েই তৈরি হচ্ছে সংঘাত কিংবা সহিংসতা। দাবি আদায়ের মতো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে সহিংস।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মাস পরও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না ঢাকা। নানা ইস্যুতে প্রায় প্রতিদিনই রাজপথ বন্ধ করে কোনো না কোনো দাবি আদায়ে আন্দোলন হচ্ছে। এতে জনজীবনে স্বস্তি ফিরছে না। এসব আন্দোলনের পর কিছু ‘দুর্বল’ ও ‘অযৌক্তিক’ দাবি মেনে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ কারণেই অন্য পক্ষগুলো দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যে কেউ যেকোনো দাবিতে আন্দোলন করলেই সরকারকে নমনীয় হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল দাবিকেও মেনে নেওয়া হচ্ছে। যা নতুন আন্দোলন তৈরিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। এসব দাবির কোনো কোনোটির যৌক্তিকতা থাকলেও বেশিরভাগ দাবিকে অযৌক্তিক ও ভোগান্তিমূলক মনে করেন রাজধানীর সাধারণ মানুষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। আবার এমন কথাও আছে, কোনো কোনো দাবি দুরভিসন্ধিমূলক।
কোন ধরনের দাবি মেনে নেওয়া হবে, কোনটি মানা সম্ভব নয় তা অন্য সবার চেয়ে সরকার ভালো বোঝে। কারণ দেশের সব মানুষের কথা মনে রেখে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবেচনায় এই মুহূর্তে ঠিক কোন বিষয়টি প্রাধান্য দিতে হবে তা দায়িত্বপ্রাপ্তরা যেমন বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এটাও মনে রাখতে হবে, সরকারকে অবশ্যই সরকারের মতো দৃঢ়চিত্তে, বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমন কোনো দাবি মেনে নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সুযোগসন্ধানীরা দাবি আদায়ের নামে জনজীবনে অস্থিরতা নিয়ে আসে। দেখা যাচ্ছে, কখনো শিক্ষার্থী, কখনো আনসার, কখনো প্যাডেলচালিত রিকশাচালক, কখনো ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক, গার্মেন্ট শ্রমিক, চিকিৎসক-নার্স, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চাকরিজীবী, নাট্যকর্মীসহ পেশাজীবীরা প্রতিনিয়ত আন্দোলনে উত্তাল রাখছেন রাজধানী। নানা দাবিকে ঘিরে কমবেশি প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে খ- খ- আন্দোলন। আবার কখনো তা সহিংস আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নতুন নতুন দাবিতে আন্দোলন সৃষ্টি হওয়াকে সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার মানসিকতাকে দায়ী করছেন অনেকেই। যার শুরু আন্দোলনের মুখে এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করার মধ্য দিয়ে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘সরকারের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা ও দাবি থাকবে তা স্বাভাবিক। তবে এসব দাবি কোনটা মানতে হবে এবং কোনটা অ্যাভয়েড করতে হবে তা পর্যালোচনা করতে হবে। সব দাবি মেনে নেওয়া হলে দাবি আদায়ের স্রোত তৈরি হবে, যা এখনো দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।’
সরকারের কাছে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান আমরা চাইব এটা স্বাভাবিক। পাশাপাশি এটিও মনে রাখা দরকার, বর্তমানে চলছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছেন, জনগণের কল্যাণার্থে। এই মুহূর্তে বিভিন্ন দাবির স্রোতে সরকারকে ভাসিয়ে না রেখে, নির্দিষ্ট জরুরি কাজ করতে দেওয়াই শ্রেয়। তারপরও সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করার। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে ‘ঢাকা’ যেন বিশেষ্য পদ না হয়। নিকট ভবিষ্যতে এই শহর যেন চিহ্নিত না হয় দাবির শহর হিসেবে।
