বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য সরকারকে কোনো আদেশ দিতে অস্বীকার করেছে হাইকোর্ট। চট্টগ্রামে সমাবেশ ও সংঘর্ষসহ সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় আদালত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ আশা প্রকাশ করে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
গত বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মনির উদ্দিন ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে দুটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বেঞ্চে উত্থাপন করেন এবং আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ইসকনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং চট্টগ্রাম ও রংপুরে জরুরি অবস্থা জারির জন্য আদেশ চেয়ে প্রার্থনা করেন।
পরে ইসকন বিষয়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চায় হাইকোর্ট। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল এ পর্যন্ত নেওয়া সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে এই বলে অবহিত করে যে, চট্টগ্রামের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি মামলা করেছে। ইতিমধ্যে ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আইনজীবী হত্যায় ভিডিও ফুটেজ দেখে ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ ও যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়ানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে হাইকোর্টকে জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদ উদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসাদ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা হাইকোর্টকে বলেছি, এ বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। আদালত সরকারের তৎপরতায় আশ্বস্ত হয়েছেন। হাইকোর্ট বলেছেন, সরকারের এই তৎপরতা যেন অব্যাহত থাকে। আর নতুন করে কোনো মানুষের জীবনহানি না ঘটুক এবং সবার জন্য কল্যাণকর পরিস্থিতি যেন বিরাজ থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবেদনকারী আইনজীবী ইসকনকে নিষিদ্ধ করার আরজি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা বলেছি, এটা সরকারের পলিসির (নীতিগত) বিষয়। আপাতত আমাদের যে উদ্বেগের বিষয় ছিল তাতে দেখা যাচ্ছে যে, সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
চট্টগ্রাম আদালতে কাজ বন্ধ : আইনজীবী সাইফুল ইসলাম হত্যার প্রতিবাদে এবং ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে গতকাল চট্টগ্রাম, ঢাকার সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ ছিল আদালতের কার্যক্রম। চট্টগ্রামের ৭৪টি আদালতে কোনো শুনানি হয়নি। সকালে জেলা আইনজীবী সমিতির পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদ জানান আইনজীবীরা।
আইনজীবী হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি রয়েছে।
মানববন্ধন থেকে আইনজীবী সাইফুলের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানানো হয়। দুপুর পৌনে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত তারা মানববন্ধন করেন। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠনও আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কালো ব্যাজ ধারণ করে হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আইনজীবীরা। জোহরের নামাজের পর কোর্ট হিল মসজিদে নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া হয়েছে।
নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) এএনএম হুমায়ুন কবির বলেন, চট্টগ্রাম আদালতের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কোনো মামলার শুনানি হচ্ছে না। মামলাগুলো পরের তারিখে রাখা হচ্ছে। দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ থাকার বিষয়টি বিচারপ্রার্থীরা আগে-ভাগে জানতে পেরে আদালতে আসেননি। তবে কিছু লোকজন এসে ফিরে যান। এদিকে গতকাল সাইফুল হত্যা ও ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জেও বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ইসকন নিষিদ্ধের দাবি সুপ্রিম কোর্ট বারের : ইসকনকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে তাদের নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি (সুপ্রিম কোর্ট বার)। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট বারের শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে উগ্র সংগঠন ইসকন সদস্যদের হামলায় আইনজীবী সাইফুলকে হত্যার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ইসকনের কেউ নন : এদিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গত জুলাইতে ইসকন (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ) বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংগঠন নেতারা। গতকাল রাজধানীর স্বামীবাগে ইসকন আশ্রমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চিন্ময় দাসের বিরুদ্ধে শিশুদের সঙ্গে অসদাচরণ ও খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে ইসকন সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেন, ‘অনেক মাস আগেই প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌর দাস, সদস্য স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস এবং চট্টগ্রামের পু-রীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ইসকন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং উল্লেখ করা হয়, তাদের দ্বারা সংঘটিত কার্যক্রম ইসকনের নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইসকন বাংলাদেশকে নিয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছড়ানোর এক ধারাবাহিক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষত চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এ অপচেষ্টা চরমে পৌঁছেছে। এটা করা হচ্ছে অন্যায়ভাবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং চলমান আন্দোলনের সঙ্গে ইসকন বাংলাদেশের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। এ মিথ্যাচার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সড়ক দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলোকেও ইসকনের চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
ইসকন সভাপতি সত্যরঞ্জন বাড়ৈ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ইসকন বাংলাদেশ একটি অরাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সংগঠন, যা সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত।’ তিনি আইনজীবী সাইফুল হত্যার ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। চিন্ময় দাসকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা ও রাজ্যের বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্নের ইসকনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হৃষীকেশ গৌরাঙ্গ দাস বলেন, ‘ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, এটি ভারত থেকে পরিচালিত নয়। কোনো ব্যক্তি কী বললেন, সেটা তাদের বিষয়।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নিন্দা : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘কোনো ধর্মের ওপরই আঘাত আসুক আমি চাই না। এখানে ইসকনের যিনি আছেন, তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এটা যেহেতু অন্য একটি দেশের বিষয়, তাই কেন্দ্রীয় সরকারকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ইস্যুতে আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের পাশেই আছি।’ গতকাল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মমতা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন। এর আগে তার দলের একজন সংসদ সদস্য, সৌগত রায় দিল্লির সংসদ ভবনে সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেছিলেন, ‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা, চিন্তার বিষয়। হিন্দুদের ওপর এ অত্যাচার হওয়া উচিত নয়। আমি এ ধরনের ঘটনার নিন্দা জানাই।’
এর আগে কংগ্রেস নেত্রী ও সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা লিখেছেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার ও ‘সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ক্রমাগত ঘটে চলা সহিংসতার সংবাদ অত্যন্ত চিন্তাজনক’। তিনি লিখেছেন, ‘আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করব যাতে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হয় এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।’
