সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাতেই থাকছে শাহবাগ থানা

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:০৩ এএম

রাজধানীর শাহবাগ থানা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে থানাটি বর্তমান জায়গা থেকে সামান্য সরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘেঁষে উত্তর দিকে মুখ করে নতুন করে নির্মাণ করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার তেজগাঁও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই বৈঠক। এতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয়পর্যায়) (প্রথম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শাহবাগ থানা নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার শাহবাগ থানাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকা থেকে সরিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশের সাকুরা রেস্তোরাঁ এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

উপদেষ্টার পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, শাহবাগ থানাটি একটুখানি হয়তো সরাতে হবে। কিন্তু মোটামুটি কাছাকাছি জায়গায় থাকবে। এখন যে জায়গাটি থানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি অস্বাস্থ্যকর, সেখানে পুরনো, বিকল ও জব্দ করা গাড়ি রাখা হয়। এটির নান্দনিক অবস্থা খুবই খারাপ। সৌন্দর্য রক্ষা হয় না। এগুলো সরিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ফুলের মার্কেটও পুনর্বিন্যাস করার চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, বারডেম ও ঢাকা ক্লাবের কাছাকাছি একটা জায়গায় থানা নেওয়া হবে। উপদেষ্টারা জায়গা পরিদর্শন করে স্থান চূড়ান্ত করবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে আবদুর রশীদ বলেন, সাকুরার পাশে শাহবাগ থানাকে সরানো খুব একটা উপযোগী জায়গা বলে মনে হয়নি। সেখানে আন্তর্জাতিকমানের বিখ্যাত হোটেলগুলোর একটি রয়েছে। যেখানে থানা স্থানান্তরের কথা বলা হচ্ছিল, ওই জায়গার মালিক জায়গা দিতে চাচ্ছেন না।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বৈঠকে জুলাই-আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের ওপর আন্তর্জাতিকমানের তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয়পর্যায়ের প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলে আসছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ তৃতীয়পর্যায়ের প্রকল্পের নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ কাজ মূলত শাহবাগ-সংলগ্ন এলাকায়। এ প্রকল্পের এলাকায় শাহবাগ থানা হওয়ায় এটি স্থানান্তর করা না হলে প্রকল্পটির নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলাসহ সার্বিক কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে অসুবিধা হবে।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় গত মার্চে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এক চিঠি দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তর থেকে শাহবাগ থানা সরানো জরুরি। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৩ জুন তৎকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শাহবাগ থানার নতুন ঠিকানা হবে সাকুরা রেস্তোরাঁ এলাকায়।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলন : বিভিন্ন মহল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রীকৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘকে (ইসকন) নিষিদ্ধের দাবি উঠলেও এ বিষয়ে সরকারের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনো সংস্থা নিষিদ্ধের কোনো আলোচনা সরকারের মধ্যে হয়নি। ব্যক্তির অপরাধের সঙ্গে সংস্থার অপরাধ আমরা মিলিয়ে ফেলব না।’

তিনি বলেন, সবকিছু আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হচ্ছে। যেকোনো বিষয়েই রাস্তায় নামার প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বিরোধে না জড়াতে আহ্বান জানান উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান।

এ সময় উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। যাতে কোনো ধরনের বিতর্ক তৈরি না হয়।

মাহফুজ আলম বলেন, বাংলাদেশে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আছে। এখানে ইসকন এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রামে যিনি নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে দুটি মামলা হয়েছে। আরও মামলা হতে পারে এবং গ্রেপ্তার চলমান রয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা চেষ্টার যে অপচেষ্টা ছিল, তা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো, ধর্মীয় কমিউনিটি সবাই মিলে তা রুখে দিয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন। দল দুটির পক্ষ থেকে দেশের অখ-তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কথা জানানো হয়েছে। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় এবং যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও উগ্রতা রুখে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। দুটি দলই প্রধান উপদেষ্টাকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

মাহফুজ আলম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।

নির্বাচন-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার শেষে নির্বাচনের তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে।

এ সময় তিনি বলেন, কোনো চাপে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়নি। এটা একটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবি থাকলেও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে কোনো চাপ ছিল না।

এ বিষয়ে মাহফুজ আলম বলেন, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সংস্কারের পরই নির্বাচন দেওয়া। তবে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত আসবে।

আদালতে হামলার বিষয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, সারা দেশে আদালতের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। যারা উচ্চ আদালতে ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিল এবং প্রচলিত নিয়মে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ সময় তিনি বলেন, সবাইকে সংযত ও ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কারও সঙ্গে কারও যদি বিরোধ থাকে, তাহলে হিংসাত্মক প্রক্রিয়ায় প্রকাশ করলে তো ফল পাওয়া যাবে না। হয়তো দাবিটা যৌক্তিক। কিন্তু সেই দাবি আদায়ের পদ্ধতি যদি সহিংসতা হয়, সে ক্ষেত্রে ন্যায্য দাবিও পূরণ হবে না। সবাইকে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকা- থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায় বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত