মির্জা আজমের ডানহাত ছিলেন জামালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু। তার অবাধ্য হলেই নির্যাতন। তার হাত থেকে রেহাই পায়নি নিজ দলের নেতাকর্মীরাও; সাধারণ মানুষ তো নির্যাতিত হয়েছেই। জেলা শহর তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। মির্জা আজমের সাম্রাজ্যে কার্যত তার আইনই কার্যকর ছিল, দেশের আইন নয়। পুলিশ ও প্রশাসন তার কথায় চলত। জমিদখল, টেন্ডারবাজি প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার ছিল নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে পালিয়েছেন মেয়র ছানুও। এখন তার অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে নির্যাতিত লোকজন।
মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানুর বাড়ি জামালপুর শহরের পাথালিয়ায়। তিনি ওখানকার সাবেক কমিশনার মরহুম হবিবুর রহমান হবির ছেলে। জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ সংসদে ছাত্রলীগের সহ-ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে তার রাজনীতির শুরু। পরে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। দীর্ঘ সময় দলীয় কোনো পদ ছিল না তার। পরে আস্তে আস্তে মির্জা আজমের আস্থা অর্জন করেন। হয়ে ওঠেন মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠজন। মির্জা আজমের স্ত্রীর ভাতিজিকে বিয়ে করে আরও ঘনিষ্ঠ হন। ২০১৫ সালে জেলা আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে টপকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হন। ২০২১ সালে পৌরসভার নির্বাচনে মির্জা আজমের কারিশমায় বাগিয়ে নেন দলের মনোনয়ন। নৌকা প্রতীকে মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর হয়ে যান পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০২২ সালে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মেয়র ছানু। গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। মির্জা আজম ও তার স্ত্রী আশীর্বাদ ছিল তার ওপর।
মেয়র হয়েই ছানু শুরু করেন জমি দখল, টেন্ডারবাজি ও নিয়োগবাণিজ্য। জেলা শহরের সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলে নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে নেওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন তিনি। মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ ও স্বজন; এসব বিষয়ে কেউ কথা বলার সাহস পেত না। কথা বললেই চলত ফিল্মি স্টাইলে নির্যাতন। তার বাহিনীর সদস্যরা তাকে পৌরপিতা বলে প্রচার করত। তার বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই পৌরসভার অস্থায়ী কর্মচারী ছিল। তাদের ডিউটি ছিল মেয়রের অবাধ্য হওয়া মানুষকে নির্যাতন করা। নানা অমানবিক কাজ করেও অনুসারীদের কাছে ছানু ছিলেন মানবিক মেয়র। ছানুর নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাননি প্রতিবেশী, নিজ দলের নেতাকর্মী এবং তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ। ২০২৩ সালের রমজান মাসে পাথালিয়ার আবদুর রশিদের ছেলে পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি ও মেয়র ছানুর প্রতিবেশী নুর হোসেন আবাহনী মেয়রের জমি দখলের প্রতিবাদ করায় চরম নির্যাতনের শিকার হন। তার ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়।
ছাত্রলীগ নেতা নুর হোসেন আবাহনী বলেন, ‘মেয়রের জমি দখলের পদ্ধতি অদ্ভুত। তার পুরাতন বাড়ির বিপরীতে নতুন আরেকটি বাড়ি করছেন মেয়র। ওই বাড়ির পেছনে অনেক ফসলি জমি। সেই জমিতে মেয়রের বাবার (হবি মেম্বার) করা গভীর নলকূপ থেকে সেচ দেওয়া হতো। মানুষকে বিপদে ফেলতে ও জমিগুলো গ্রাস করতে প্রথমেই ওই গভীর নলকূপ থেকে পানি সেচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। পরে জমিগুলো দখল করতেন মেয়র। মানুষের কথা ভেবে ফেসবুক লাইভে প্রতিবাদ করেছিলাম। এটি দেখে মেয়র লোক দিয়ে আমাকে পৌরসভায় ধরে নিয়ে যায়। পরে মেয়র আমাকে পিস্তল ঠেকিয়ে গাড়িতে তোলেন। মেয়র ছানু আমার নাকে ঘুসি মারেন। পরে তার বাড়ির পাশে একটি ঘরে (টর্চার সেল) নিয়ে আমাকে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করে তার সন্ত্রাসী বাহিনী। নির্যাতনের একপর্যায়ে ইফতারের সময় হলে আমাকে শুধু পানি খেতে দেওয়া হয়। পরে মেয়রের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন আনু ও মেয়রের সন্ত্রাসী বাহিনীর তাজুসহ কয়েকজন আমাকে ইটের ভাটায় নিয়ে আবার মারধর করে ও মাথা মুড়িয়ে দেয়, ভ্রু ফেলে দেয়। লোহার রড, হকিস্টিক ও বাঁশের গোড়ালি দিয়ে আমাকে বেধড়ক পিটুনি দেয়। একপর্যায়ে জবাই করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। হঠাৎ তাজুর ফোনে কল আসে। তখন আমাকে জবাই না করে মেয়রের মামা হাসানের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আমার হাত-পা ভেঙেছে কি না দেখা হয়। তারপর আবারও আমাকে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ ডেকে আমাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। থানায় আমার নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।’
একটি বেসরকারি হাসপাতালে নির্যাতনের শিকার ছাত্রলীগের নেতাকে নেওয়ার খবরে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সেখানে যান। তখন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ভিডিও সাংবাদিক গোপনে ভিডিও করতে যান। মেয়র ছানুর সন্ত্রাসী বাহিনীর এক সদস্য বিষয়টি টের পেয়ে তাকে অবহিত করে। মেয়র ছানু ক্ষিপ্ত হয়ে ওই সাংবাদিককে বলেন, ‘কী করস, ভিডিও করছিস কেন?’ তখন সাংবাদিক বলেন, ‘আমি কোনো ভিডিও করিনি।’ মেয়র ছানু রেগে গিয়ে বলেন, ‘আমাকে সাংবাদিকতা শিখাস। আমি সাংবাদিকদের বাপ।’
ছানুর আরেক প্রতিবেশী জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বাহাজের ছেলে শিক্ষার্থী মাহিন বাড়ির সামনে বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় একটি ব্যানার টানিয়ে ছিলেন। এ কারণে মেয়র ছানু তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মাহিনকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করেন।
মাহিনের বাবা বিএনপি নেতা আরিফুল ইসলাম বাহাজ বলেন, ‘একটি ব্যানার লাগানোর অপরাধে আমার ছেলেকে মেয়রের সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে গিয়ে তার বাড়ির সামনে ফেলে নির্মমভাবে মারধর করেছে। জীবন বাঁচাতে আমার ছেলে দৌড়ে মেয়রের বাড়িতে ঢুকে তার মায়ের পায়ে পড়ে। তখন মেয়রের বউ আমার ছেলের বুকে লাথি মারেন। ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিই। চার দিন চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়।’ ওই এলাকার অনেকেই মেয়রের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সে সময় মিথ্যা মামলার ভয়ে এ ঘটনায় মামলা করতে সাহস পাননি তিনি।
ছানুর বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয় আরেক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ওয়াহিদুল করিম তন্ময় গত ২৯ মার্চ (শুক্রবার) জুমার নামাজ শেষে পৌর কবরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত করতে যান। তাকে পৌর কবরস্থানে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।
মির্জা আজমের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে জামালপুর শহরের নাওভাঙায় প্রায় দেড়শ পরিবারের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও ব্রহ্মপুত্র নদ দখল করেন মেয়র ছানু। এ ক্যাম্পাস নির্মাণে জোরপূর্বক জমিদখল করতে ওই এলাকার নিরীহ মানুষের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।
নির্যাতনের শিকার আস্তালীর ছেলে মো. আতাহার আলী জানান, তাকে মির্জা আজমের বাড়ির সামনে (বকুলতলায়) ডেকে নিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙতে বলেন মেয়র ছানু। তখন তিনি মেয়রকে বলেন, ‘ঘর তো আমি ভাঙমু (ভাঙব) না। আমি খাসজমিতে থাকি না।’ এ কথা বলার দুই ঘণ্টার মধ্যে আমাকে পুলিশে দেওয়া হয়। পরে ওসি আমাকে বলেছে, ‘তুমি যদি ছানুর কথা না শোনো, ঘরবাড়ি না ভাঙো, তাহলে আমরা মার্ডারের মামলা দিয়ে তোমাকে চালান দিয়ে দেব। পরে মার্ডারের মামলা না দিয়ে গোদাশিমলায় বিকাশের দোকানের মোবাইল ছিনতাইয়ের মামলায় আমাকে চালান দিয়ে দেয়। আমি জীবনে কোনোদিন গোদাশিমলায় যাইনি। ১৫ দিন জেল খেটেছি। চাপ সহ্য করতে না পেরে ঘর ভেঙে ফেলি।’ তার দাবি, ওই বিশ^বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন স্থায়ী ক্যাম্পাসে ৫ একর ৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে তার। সেই জমির টাকা পাননি তিনি।
ওই ক্যাম্পাসের জমি নিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে একই এলাকার সাজল মিয়ার পরিবার। সাজল মিয়া বলেন, “ওরা বহুত অত্যাচার করছে। সম্বাদিক (সাংবাদিক) এটাকা (একটাকে) বেড়াইয়ে (পিটিয়ে) মারছে। ওই ভয় আমাদের দেখাইছে। আমার মেয়ে কইছে, আমরা খাসের জমিতে বাড়ি করে অই নাই (রয় নাই)। আমগোর সব কেনা সম্পত্তি, দলিল করা সম্পত্তি। ‘বাড়ি ভাঙোস না ক্যান’ এ কথা বলাতে আমার মেয়ে কইছে ‘আপনি বাইরেয়ে (পিটিয়ে) ভাঙেন’। তারা বলে, ‘বাড়ি ভাঙবি সাইরে, যখন নিয়ে কাচের ঘরে ঢুকাই থুইয়ে (রেখে) আমু (আসব) পুলিশ দিয়ে, তখন সবি করবি’।” তিনি আরও বলেন, “আমি কাঁঠাল, আম ও কলার বাগান দিয়ে থুইছিলাম বাড়ির পাছে (পেছনে)। এগুলো সব ছাপ (সাফ) করে থুইয়ে গেছে। পায়খানা থেকে ‘গু’ (মল) ভেগু দিয়ে দরজায় মারছে। যাতে থাকা না যায়। যাওয়ান নাগে (লাগে)।” তার ছেলের বউকেও নির্যাতন করেছে বলে তিনি জানান। মেয়র ছানু ও মির্জা আজমকে মামীম, আইনাল, এরশাদ আলী ও সাবেক কাউন্সিলর রুনু খান সহযোগিতা করেছে বলেও তিনি জানান। মেয়র ছানুর নির্যাতন ও অত্যাচারের আরও অনেক কাহিনি রয়েছে।
জমি দখল, নামমূল্যে জমি কেনা ও টেন্ডারবাজি : মেয়র ছানোয়ার হোসেন ছানু জামালপুর শহরের কমপক্ষে ২০ জায়গায় জমি দখল ও নামমাত্র মূল্যে জমি কিনেছেন। শহরের কম্বপুর মোড় থেকে ঝিনাই ব্রিজ পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ১০ বিঘা জমি, শহরের টিকাপট্টি, রানীগঞ্জ বাজারে গ্লুকোজ ফ্যাক্টরির জায়গা, নাওভাঙা চরে জমি দখল করেছেন। উপজেলার শরীফপুর এলাকার শতাব্দী তেলের পাম্প, ছনকান্দায় ইটভাটা, কাচারিপাড়া এলাকায় এমএ রশিদ হাসপাতালের সমানে জমি, মির্জা আজম চত্বরের পাশে জমি নামমাত্র মূল্য দিয়ে দখল করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
বিভিন্ন দপ্তরে টেন্ডারবাজি করতে মেয়র ছানুর ছিল নিজস্ব সিন্ডিকেট। কাজ বাগিয়ে নিতে ৩৯৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করেন মেয়র। বালুমহাল ও বিভিন্ন দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজেও তার প্রভাব ছিল।
জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতি ও অপরাধ দুয়েরই নিয়ন্ত্রণ : জামালপুর জেলা ছাত্রলীগ, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি ও অপরাধ দুটোই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বঙ্গমাতা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক মেয়র ছানুর বিশ^বিদ্যালয়ের টেন্ডারবাজিতে নিয়োজিত ছিলেন। জেলা ও পৌর ছাত্রলীগ নানা অপরাধে লিপ্ত ছিল। ছানু জমি দখলে ও টেন্ডারবাজিতেও তাদের ব্যবহার করেছেন।
