মসজিদ ডট লাইফের সুদমুক্ত ঋণ

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৫২ এএম

নানা কারণে মানুষকে ঋণ নিতে হয়। এই আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে শ্রেণিভেদে মানুষ মূলত ব্যাংক, এনজিও কিংবা মহাজনী সুদখোরদের ওপর নির্ভরশীল। তৃতীয় উৎসটি আইনকানুন, নিয়মনীতি, জবাবদিহি ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে শেষ করে দিচ্ছে প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। দেশে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ব্যাংক ও এনজিও সেবার বাইরে রয়েছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তাদের সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে তারা ক্রমেই নিঃস্ব হচ্ছেন। কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ।

বাংলাদেশের প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণির ঘুরে দাঁড়াবার কিংবা তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে মূল সমস্যা হলো মাত্রাতিরিক্ত এই সুদভিত্তিক ঋণ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে রেখে দেশের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুদখোর মহাজনের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে ব্যাংক ও এনজিও সেবাবঞ্চিতদের জন্য সুদমুক্ত ঋণব্যবস্থা চালু করা খুবই জরুরি। ইতিমধ্যে ‘মসজিদ ডট লাইফ’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এই কাজটি সফলভাবে করে দেখিয়েছে। বহু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর পাশাপাশি স্বাবলম্বী করেছে অনেককে।

প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ সাধারণত ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। মনে করুন, ধনী থেকে দরিদ্রের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষকে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত শ্রেণিতে ভাগ করা হলো। সবচেয়ে ধনী ১ এবং সবচেয়ে দরিদ্র ১০। ব্যাংকগুলো দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার কারণে তাদের সেবার জন্য ১ থেকে ৫ পর্যন্ত টার্গেট করল। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ লোক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসল। তার মানে ৬ থেকে ১০ শ্রেণি অর্থাৎ বাকি ৫০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে থেকে গেল। ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে ব্যবসা বা সেবা প্রদানের জন্য এনজিওর উৎপত্তি হলো। তাদের সামনে আছে ৬ থেকে ১০ নম্বর শ্রেণিভুক্ত ৫০ শতাংশ মানুষ, যারা ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত। যদিও এনজিওগুলোর বেশিরভাগই তাদের তহবিল সংগ্রহের জন্য অনেকাংশেই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল।

মনে করুন, বিভিন্ন ফ্যাক্টর বা বাস্তবতার বিবেচনায় এনজিওগুলো ৬ ও ৭ নম্বর শ্রেণিভুক্ত ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে তাদের ব্যবসা বা সেবার জন্য টার্গেট করেছে। তার মানে, উদাহরণ অনুসারে ৮, ৯ ও ১০ এই তিনটি শ্রেণি অর্থাৎ দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ ব্যাংক ও এনজিওগুলোর সেবার বাইরে রয়ে গেল। এই ৮ থেকে ১০ শ্রেণিটিকেই আমরা প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণি হিসেবে অভিহিত করছি, যারা ব্যাংকিং সেবা তো পাচ্ছেই না, বরং এনজিওগুলো থেকে সেবা পাওয়াও তাদের জন্য অনেক কঠিন।

এই ৩০ ভাগ মানুষের জন্য রয়েছে মহাজনী সুদখোর, যাদের সুদের হার অবিশ্বাস্য রকমের বেশি এবং কখনো কখনো তা এক হাজার শতাংশ অতিক্রম করে যায়! গলায় ফাঁস লাগার সমূহ সম্ভাবনা আছে জেনেও বিকল্প কোনো উপায় না পেয়ে এসব সুদখোর মহাজনের কাছ থেকে বাধ্য হয়ে চড়াসুদে ঋণ নিচ্ছে প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণির অসংখ্যা মানুষ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গলাকাটা মহাজনী সুদখোরদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত রেখে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সহায়তার জন্য দেশব্যাপী চলছে মসজিদ ডট লাইফের কার্যক্রম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংক কিংবা এনজিওগুলো কোনোভাবেই মসজিদ ডট লাইফের প্রতিপক্ষ নয়। মসজিদ ডট লাইফের প্রতিপক্ষ হচ্ছে গলাকাটা মহাজনী সুদখোর শ্রেণি।

দেশের প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণির আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনতে মসজিদ ডট লাইফ বা এর মতো কর্জে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণসেবা প্রদানকারীদের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো প্রান্তিক মানুষকে সামান্য পরিমাণ লোন দিতে যেসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয় সেটার জন্য অনেক সময় তাদের একাধিক দিনের কর্ম নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে মসজিদ ডট লাইফের সেবা ‘সুদমুক্ত ঋণ’ তারা তাদের পাড়ার মসজিদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবেই পেয়ে যান।

সুদমুক্ত ঋণ সহজলভ্য করতে মসজিদ ডট লাইফের কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা শুরু করেছে। এটি শতভাগ স্বেচ্ছাসেবী ও মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রম। মসজিদগুলোতে ব্রাঞ্চ খুলে সেখানকার মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত টিমের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে কোনো ধরনের ব্যয় না থাকায় ঋণগ্রহীতাকেও বিভিন্ন অজুহাতে বাড়তি ব্যয় করা লাগে না। ঋণের অর্থ ছোট ছোট কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারেন তারা। সমস্ত কার্যক্রম অনলাইন ও সফটওয়্যার-ভিত্তিক হওয়ায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ এর হিসাব-নিকাশ ও অন্যান্য তথ্য জানতে পারেন সহজেই। ম্যানেজমেন্ট টিম, মসজিদ কমিটি ও ঋণগ্রহীতার সঙ্গেও সরাসরি কথা বলার সুযোগ রয়েছে। এক কথায় শভভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কার্যক্রমে ধর্মীয় কর্মসূচি কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। সব ধর্ম ও মতের মানুষদের ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এখান থেকে।

কর্জে হাসানা প্রতিষ্ঠায় যেকোনো ধরনের অবদান একদিকে উচ্চ মানের ইবাদত অন্যদিকে দেশপ্রেম। সুদের বিপরীতে কর্জে হাসানার একটি মজবুত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে যার যার জায়গা থেকে ফিনান্সিয়াল, ম্যানেজমেন্ট, প্রোমোশনাল বা ইন্টেলেকচুয়াল সাপোর্ট দিতে সবাই এগিয়ে আসবেন অথবা প্রতিদিনের দোয়ায় শামিল রাখবেন এটাই প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ সুদ হারাম করেছেন। সুদের গুনাহের সর্বনিম্ন অপরাধ হলো মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারের সমতুল্য নিকৃষ্ট গুনাহ। সুদি কারবারের সঙ্গে জড়িতদের আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামিল হওয়ার মতো গুনাহের কথা বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত